এবার শীতপ্রধান এলাকা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ফুটেছে নেদারল্যান্ডসের জনপ্রিয় ফুল টিউলিপ। এতে ৪০ লাখ টাকার ফুল বিক্রির আশা করছেন চাষিরা। একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে এই ফুল চাষের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তারা।
চাষিরা জানিয়েছেন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে ও ইএসডিও প্রকল্পের সহায়তায় ৪০ শতক জমিতে টিউলিপ ফুল চাষ করেছেন তারা। এতে ৩২ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। খরচ বাদ দিয়ে দুই মাসে ফুল বিক্রি করে আট লাখ টাকা আয় হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তেঁতুলিয়ার শারিয়াল জোত ও দর্জিপাড়া গ্রামের মুক্তা বেগম, আনোয়ারা বেগম, সুমি আক্তার, আয়েশা বেগম, হোসনেয়ারা বেগম, মনোয়ারা বেগম, মোর্শেদা বেগম ও সাজেদা বেগম টিউলিপ ফুল চাষ করেছেন। ছয় প্রজাতির ১২ রংয়ের টিউলিপ চাষ করেছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্ট্রাকটিকা (হোয়াইট), ডাচ সানরাইস (ইয়েলো), পারপেল প্রিন্স (পারপেল), টাইমলেস (রেড হোয়াইট শেডি), মিল্কসেক (লাইট পিঙ্ক), বারসেলোনা (ডার্ক পিঙ্ক), অ্যাড রেম (অরেঞ্জ), লালিবেলা (রেড), দি ফ্রান্স (রেড), রিপ্লে (অরেঞ্জ), ডেনমার্ক (অরেঞ্জ) ও স্ট্রং গোল্ড (ইয়েলো)। এরই মধ্যে টিউলিপ ফুলে বাগান ভরে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চগড়ে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কম থাকায় টিউলিপ ফুল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এটি প্রমাণ করেছেন এসব চাষি।
পরীক্ষামূলকভাবে টিউলিপ ফুল উৎপাদন করে অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছেন তারা। বর্তমানে প্রতিটি ফুল ১০০ টাকা দরে বাগান থেকে বিক্রি হচ্ছে। বছরের অন্য সময় এসব জমিতে দেশি-বিদেশি অন্য ফুল চাষ করবেন চাষিরা। পাশাপাশি ক্ষুদ্র পরিসরে বিনোদন পার্ক তৈরি করে পর্যটকদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। জনপ্রতি ১০০ টাকা প্রবেশ মূল্য। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক মূল্যে দেখার সুযোগ রয়েছে। এই থেকেও তারা বাড়তি আয় করতে পারছেন।
মোর্শেদা বেগম বলেন, গাছ লাগানোর পর ফুল ফুটবে কিনা এ নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু ইএসডিও ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে ১৬ দিনের পরিচর্যায় ফুলের কলি আসে। ২০-২৪ দিনের মধ্যেই ফুল ফুটতে শুরু করে। অধিকাংশ গাছে ফুল ফুটেছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাকি গাছেও ফুল ফুটবে।
আয়েশা বেগম বলেন, টিউলিপ চাষের প্রধান অন্তরায় এই ফুলের বীজ আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। বিদেশ থেকে আনতে হয়। এতে অনেক টাকা শুল্ক লাগে। শুল্কমুক্ত বীজ আমদানি করতে পারলে ফুলের চাষ বাড়বে।
মুক্তা বেগম জানান, সরকারিভাবে বিদেশ থেকে কম দামে টিউলিপের বীজ সরবরাহ করলে ফুলের চাষাবাদ বাড়বে। চাষিরা আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হবেন।
ইএসডিও প্রকল্পের সমন্বয়কারী মো. আইনুল হক বলেন, পিকেএসএফের সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইএসডিও তেঁতুলিয়ায় ৪০ শতক জমিতে চাষিদের দিয়ে ৪০ হাজার টিউলিপ বীজ রোপণ করায়। এরই মধ্যে সব বাগানে ফুল ফুটেছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি টিউলিপের বীজ ৬২ টাকায় নেদারল্যান্ডস থেকে কেনা হয়েছে। বীজের পাশাপাশি চাষিদের বিনামূল্যে রাসায়নিক সার, জৈব সার, খৈল, শেডনেট, ফেন্সিংনেটসহ চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে আরও এক হাজার চাষিকে টিউলিপ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হবে। চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা, বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা কমানো, বাণিজ্যিকভিত্তিতে টিউলিপ চাষ, পর্যটনে উদ্ধুদ্ধ করা, উৎপাদিত ফুল ও বীজ সংরক্ষণ করা, সারাদেশে ফুল সরবরাহ, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাষিদের সক্ষমতা বৃদ্ধিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
সরেজমিনে বাগানে দেখা গেছে, সারি সারি টিউলিপ ফুটেছে। অন্যগুলোর কলি বের হয়েছে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক সবুজ ছাউনির ভেতরে টিউলিপের চাষ করা হয়েছে। বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। টিউলিপের হাসিতে উৎফুল্ল তারা। দৃষ্টিনন্দন টিউলিপ দেখতে বাগানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। বেগুনি, লাল, হলুদ, পিংক, সাদা টিউলিপ নিয়ে খেলছে শিশুরা।
ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, তেঁতুলিয়ায় এটাই প্রথম টিউলিপ ফুল চাষ। এটি সাফল্য পেয়েছে। আগামীতে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র চাষিদের অর্থনৈতিক আয় এবং সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তেঁতুলিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘাসহ অপূর্ব নৈসর্গিক যেসব পর্যটন শিল্প রয়েছে, সেগুলো আরও সম্প্রসারিত হবে। এটি এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, দিনের বেলায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই ফুল চাষ সহনশীল। বীজ রোপণের দিন হতে ১৮-২০ দিনের মধ্যে কলি আসে এবং ৬০ দিন পর্যন্ত এই ফুল স্থায়ী থাকে। বেশ কয়েকটি দেশ এই ফুল রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। যেহেতু এই ফুল চাষে এখানকার চাষিরা সফল হয়েছেন সেহেতু বাণিজ্যিকভাবে চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।