যেসব কারণে রংপুরে আ.লীগ প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয়

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে চার লাখ ২৬ হাজার ৪৬৯ ভোটারের মধ্যে দুই লাখ ৮০ হাজার ৯৭২ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে এক লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৮ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। আর আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া ২২ হাজার ৩০৬ ভোট পেয়ে হারিয়েছেন জামানত। এই নির্বাচনে ৯ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে চতুর্থ হয়েছেন নৌকার মাঝি। এত বড় নির্বাচনে টানা তিন মেয়াদে সরকারে থাকা দলের প্রার্থী এমন শোচনীয় পরাজয়ে রংপুরে চলছে নানান আলোচনা-সমালোচনা।

খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা না থাকাসহ নগরবাসীর কাছে একেবারে অপরিচিত বলে অভিযোগ এনেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বলছেন, নিজ দলের সমর্থকদের ভোটই পাননি তিনি। পেলে এমন ভরাডুবি হতো না। অন্যদিকে বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে জানা গেছে, অনেক কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টও ছিল না।

মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) হওয়া এই সিটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান এক লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান জামান পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৯২ ভোট। হাতি প্রতীকে ৩৩ হাজার ৮৮৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লতিফুর রহমান। নৌকার প্রার্থী হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া ২২ হাজার ৩০৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন সাত দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট। নির্বাচনে ২২ হাজার ৪৭৮ ভোট পেলে জামানত ফেরত পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেন। এ ক্ষেত্রে ১৭২ ভোট কম পেয়ে জামানত হারিয়েছেন তিনি।

নগরবাসী বলছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ছিলেন। কিন্তু জনগণের পাশে তাকে কখনও দেখা যায়নি। তাকে নগরবাসী চেনেন না। নির্বাচনের আগে তার দৃশ্যমান কোনও কর্মকাণ্ড ছিল না। তা ছাড়া দলের নেতাকর্মীরাও তাকে ভোট না দেওয়ায় শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।

lutfa1

পরাজয়ের নেপথ্য...

আওয়ামী লীগের মহানগর এবং ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মী ও ভোটাররা বলছেন, ডালিয়া প্রার্থী হবেন এবং নির্বাচন করবেন- এমন কোনও প্রস্তুতি তার ছিল না। নির্বাচনে আগে তিনি কখনও ২০৫ বর্গ কিলোমিটারের সিটি করপোরেশনে কোনও এলাকায় যাননি। কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে কেউ দেখেননি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের যে ৩/৪ জন নেতা নির্বাচনের দুই বছর আগে থেকে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকায় গণসংযোগ করেছেন, দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, জনগণের কাছাকাছি থাকার জন্য কাজ করেছেন- তাদের কাউকেই মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। মনোনয়ন পাওয়া ডালিয়া দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে কাজ করার কোনও চেষ্টাই চালাননি।

দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কোনও চেষ্টা তিনি করেননি। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত করার উদ্যোগও নেননি। নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনি প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট হিসেবে কাউকে নিয়োগ করেননি। এ নিয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারাও ক্ষুব্ধ। এমনকি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে দলের নেতাকর্মীদের একটা প্ল্যাটফর্মে আনার কাজটিও তিনি করেননি। শুধু তাই নয়, বিশাল সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ডভিত্তিক কিংবা ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কোনও কমিটি গঠন করা হয়নি।

তারা আরও জানান, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব না থাকা এবং দলের নেতাকর্মীদের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহের কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি বলে এমনটা হয়েছে। ফলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মী বাহিনীকে কাজে লাগানোর বাস্তবমুখী কোনও পদক্ষেপ আওয়ামী লীগ প্রার্থী নেননি।

অপরদিকে, নির্বাচনের দিন সরেজমিনে ভোট কেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে, ২২৯টি ভোটকেন্দ্রের কমপক্ষে দেড়শটিতে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীর কোনও পোলিং এজেন্ট ছিল না। আর যারা ছিলেন, তারা ভোট চলাকালেই চলে গেছেন। এমনকি অনেক কেন্দ্রে ডালিয়ার কোনও পোস্টারও দেখা যায়নি।

lutfa2

অন্যদিকে, রংপুর কোতোয়ালি মেট্রো আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি লতিফুর রহমান নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কিছু দিন আগে থেকে মেয়র পদে নির্বাচন করার জন্য প্রচারণা চালান। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে ও গোপনে অংশ নেন। পরে দলীয় নির্দেশ না মেনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বহিষ্কার হওয়ার পরও তার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মীকে প্রচার-প্রচারণায় দেখা গেছে।

নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী লতিফুর রহমান পুরো সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা করে তার নামটা প্রতি এলাকায় ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তার তুলনায়ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণা ছিল একেবারে নগণ্য। নির্বাচনে এই বিদ্রোহী প্রার্থী যে আবেদন সৃষ্টি করেছেন তার ১০ ভাগও আওয়ামী লীগ প্রার্থী করতে পারেননি বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ। এর প্রমাণ মিলেছে ভোটেই। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও বিদ্রোহী এই প্রার্থীর জামানত টিকে গেছে।

এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ছয় থানার মধ্যে তিন থানা ও ওয়ার্ড কমিটির একাধিক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, প্রথমতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রচার-প্রচারণা করার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ১৩ দিন। দলের নেতাকর্মীরা ভোট দিলেও দলের সমর্থকসহ অনেকেই ভোট দেননি আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে।

অন্যদিকে, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মন্ডল বলেন, ‘বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী প্রয়াত শরফুদ্দিন আহামেদ ঝন্টু ৬৪ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ছিল। এবারের প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা না থাকা, ভোটারদের কাছে যেতে না পারাসহ নানান কারণে শোচনীয় পরাজিত হয়েছে।’ তবে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর ভোট যোগ করলে ভোটের পরিমাণ প্রায় সমান বলে দাবি করেন তিনি।

এই বিষয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে জনগণের কোনও সম্পর্ক ছিল না তাকে নগরবাসী চেনেন না। অনেকে নামও জানেন না। তাছাড়া দলের নেতাকর্মীরাও তাকে ভোট দেননি এবং তার পক্ষে কাজও করেননি। দলের নেতাকর্মীরা ভোট দিলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হতো না। এর দায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এড়াতে পারে না।’