স্কুলড্রেস পরে না আসায় শিক্ষার্থীদেরকে বেদম মারধরের অভিযোগ উঠেছে দিনাজপুরের এক স্কুল শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন প্রধান শিক্ষক। মারধরের বিষয়টি স্বীকার করলেও এটিকে শাসন বলছেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
বুধবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে দিনাজপুর সদর উপজেলার ১নং চেহেলগাজী ইউনিয়নের চাঁদগঞ্জ এএসএম দ্বি-মূখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম নজরুল ইসলাম। তিনি ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক।
জানা যায়, এদিন সকালে স্কুলে অ্যাসেম্বলির সময় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে স্কুলড্রেস না পরা অবস্থায় দেখতে পান শিক্ষক নজরুল ইসলাম। অ্যাসেম্বলি শেষে তিনি ক্লাস থেকে ওই শিক্ষার্থীদের তার কক্ষে ডেকে পাঠান এবং লাইন করে দাঁড় করিয়ে বেত দিয়ে ৮-১০ জন শিক্ষার্থীকে বেত্রাঘাত করেন। পরে তাদেরকে স্কুল থেকে বাসায় পাঠিয়ে দিলে অভিভাবকদের বেত্রাঘাতের বিষয়টি জানায় শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা এসে প্রধান শিক্ষকের কাছে মারধরের বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ দেন। এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই শিক্ষকের বিচারের দাবি জানান তারা।
মারধরের শিকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌরভ বলেন, ‘আমাদেরকে যখন ডাকলো আমরা বললাম যে দুইদিন সময় দেন স্যার, টেইলার্স থেকে দুদিন পর দিতে পারবে বলেছে। তখন হেডস্যারও (প্রধান শিক্ষক) বললো যে মারতে হবে না। তবুও তিনি আমাদেরকে মারলেন। বলেছেন চাকরি গেলে যাক। তিনি দুদিন সময় দিলেই তো হতো। মারলো কেন আমাদের। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ ইসলাম শাকিল বলেন, ‘আমার সাদা শার্ট ছিল। প্যান্ট ছিল না শুধু। এজন্য নজরুল স্যার মারছে। মারতে মারতে বেতও ভেঙে ফেলছে। এতো জোরে জোরে কেউ মারে?’
আসিফ হাসান রিমন নামে এক শিক্ষার্থীর কথায়, ‘স্কুলড্রেসের প্যান্ট পরে না আসায় স্যার আমাকে মেরেছে। আমি স্যারকে বলেছিলাম যে রবিবার থেকে ড্রেস পরেই আসবো। অন্য স্যাররাও মারতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু কারো কথা না শুনে নজরুল স্যার আমাদেরকে মেরেছেন।’
মারধরের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিয়াম বলেন, ‘স্যারকে বলেছিলাম দর্জি প্যান্টটা কালকে দেবে। স্যার বললো যেদিন দেবে সেদিন পরে আসিও। আমি বললাম কালকে পরে আসব। কিন্তু তিনি কথা না শুনে মেরেছেন। দর্জি যদি দিতে না পারে তাহলে আমি কী করব। তাই বলে আমাদেরকে এভাবে মারবে নাকি।’
শিক্ষার্থী সিয়ামের মা সাবিনা ইয়াসমিনের ভাষ্য, ‘এভাবে আমার বাচ্চাকে মারা উচিৎ হয়নি। বাচ্চাকে লেখাপড়ার জন্য স্কুলে পাঠিয়েছি। তারা লেখাপড়া করবে। বাচ্চা যদি অন্যায় করতো তাহলে মেনে নিতাম, তারা বাচ্চাকে শাসন করেছে। এই স্কুলের ড্রেস আগে থেকে বাধ্যতামূলক ছিল না। আগে যদি তারা বলতো তাহলে আমার বাচ্চাকে স্কুলড্রেস পরিয়ে পাঠাতাম। সবার পকেটে টাকা থাকে না, স্কুলড্রেস বানাতে দিয়েছি, দর্জি ২ দিন পরে দিতে চেয়েছে। আমার বাচ্চাকে এভাবে মারাতে অন্তরে আঘাত লেগেছে। আমি এই শিক্ষকের শাস্তি চাই।’
শিক্ষার্থী ইমনের দাদি আসমা বেগম বলেন, ‘হারা গরিব মানুষ, হাতে করি পেটে খাই, আমার নাতি স্কুলে পড়তে আইছে, স্কুলের কাপড়া পরে আসে নাই বলে নজরুল মাস্টার পিটাইছে। আমি এর বিচার চাই, মাস্টারের শাস্তি চাই।’
আজহার আলী নামে অপর এক অভিভাবকের ভাষ্য,, ‘আমিও এই স্কুলে পড়েছি। আজকে স্যার যে কাজটা করলো এটা ঠিক হয়নি। একটা ড্রেস নাই বলে বাচ্চারদেরকে টর্চার করা হয়েছে। গরু পেটানোর মতো পিটাইছে। একটা ড্রেস বানাইতে গেলে অর্থের দরকার আছে, দর্জির সময়ের দরকার আছে। আমার নাতি আপন, ফয়সালসহ আরও কয়েকজনকে আজকে মারছে। না মেরে তারা আগে অভিভাবকদেরকে ডাকতে পারতো।’
এ বিষয়ে চাঁদগঞ্জ এএসএম দ্বি-মূখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক এসএম শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের স্কুলে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী আছে। স্কুলের পাশেই বাজার। কে কখন বাইরে যায় চেনা যায় না। সেজন্য আমরা স্কুলড্রেসের কথা বলেছি। এই স্কুলড্রেস পরে না আসায় নজরুল ইসলাম শিক্ষার্থীদেরকে এভাবে বেত্রাঘাত করছে এটা আসলেই দুঃখজনক। এ বিষয়ে আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক নজরুল ইসলামকে নিয়ে সমাধানের জন্য আলোচনা করা হবে। স্কুলের গভর্নিং বডির সঙ্গে আলোচনা করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যেন না ঘটে সে বিষয়ে আমরা তৎপর থাকব।’
ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষক নজরুল ইসলামকে স্কুলে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা তেমন কিছু না। এটা একটা মিস্টেক হয়েছে। বাচ্চাদেরকে একটু শাসন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অভিভাবকরা একটু বেশি বেশি করছে।’ এ সময় তিনি নিউজ না করার জন্যও অনুরোধ করেন।