চিকিৎসক, কর্মচারী আর চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা। নেই চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত ওষুধ। ছয় বছর আগে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হলেও ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আবার এই জনবলের বেশিরভাগ পদ শূন্য। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, জনবল এবং ওষুধের চাহিদা জানিয়ে বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত প্রতিবেদন দিলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার কুড়িগ্রাম হাসপাতাল পরবর্তী সময়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এটিকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদন দেয়। তবে এখনও হাসপাতালটি ১০০ শয্যার মঞ্জুরিকৃত জনবল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই জনবলের বেশিরভাগ পদ শূন্য।
চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকটে ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা
সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে চিকিৎসক ও জনবল সংকটের সত্যতা পাওয়া যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা বলেছেন, সারাদিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা মেলে। দুপুরের পর হাসপাতালে কোনও রোগী ভর্তি হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ছাড়া পরের দিন সকালের আগে ওয়ার্ডে কোনও চিকিৎসকের দেখা মেলে না। কোনও পরীক্ষা দিলে তার রিপোর্ট দেখাতে হয় পরের দিন। ফলে চিকিৎসা পেতে অনেক রোগীকে ভর্তির পর ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ওয়ার্ডের শয্যা সংকট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শৌচাগার নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন রোগীরা।
হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন সদরের মন্ডল পাড়ার বাসিন্দা রাশেদ। তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকালে প্রচণ্ড পেটব্যথা নিয়ে ভর্তি হয়েছি। ভর্তির সময় জরুরি বিভাগের চিকিৎসক দেখেছেন। এরপর রাত পেরিয়ে সকাল গড়ালেও ওয়ার্ডে কোনও চিকিৎসকের দেখা পাইনি।’
হাসপাতাল অপরিচ্ছন্ন উল্লেখ করে রাশেদ বলেন, ‘হাসপাতালের শৌচাগারে যাওয়া যায় না, একেবারে অপরিচ্ছন্ন। কক্ষের ভেতরে ময়লা-আবর্জনা।’
একই ওয়ার্ডে ভর্তি আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘প্রচণ্ড পেটব্যথা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে ভর্তি হই। কিন্তু শনিবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চিকিৎসকের দেখা পাইনি। এদিন বেলা ১১টার দিকে চিকিৎসক এসে ছাড়পত্র দেন। চিকিৎসা বলতে শুধু স্যালাইন দিয়েছে। তাও সব বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।’
মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেওয়া রিপন মিয়া বলেন, ‘গত সোমবার সন্ধ্যায় যখন ভর্তি হই তখন দেখি পুরো কক্ষে ময়লা। শয্যার নিচেও ময়লা। বলার পরও কেউ পরিষ্কার করেনি। শেষে নিজেরা পরিষ্কার করে শয্যায় উঠেছি। দিনে একবারের বেশি চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এই হইলো অবস্থা।’
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে মেডিসিন ওয়ার্ডের বেশ কিছু কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীদের শয্যার পাশে লকার নেই। রোগীরা ওষুধ, পোশাক ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র শয্যার ওপর রেখে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ৩ ও ৪ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনও শয্যা নেই। রোগীরা মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কক্ষগুলো অপরিচ্ছন্ন। অথচ ভবনটি নতুন।
চিকিৎসক সংকট ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে একই অভিযোগ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের রোগী ও তাদের স্বজনদের। ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতা এবং শৌচাগারের অবস্থা বেহাল বলে জানান তারা। কার্ডিওলজি বিভাগে ভর্তি রোগী আব্দুর রহমান বলেন, ‘রবিবার বিকালে ভর্তির পর সারারাত শ্বাসকষ্টে ঘুমাতে পারিনি। রাতে নার্স ছাড়া কোনও চিকিৎসকের দেখা পাইনি। পরের দিন সোমবার সকালে চিকিৎসক দেখে ওষুধ দিয়েছেন।’
এই ওয়ার্ডের আরেক রোগীর স্ত্রী শিরিন খন্দকার বলেন, ‘শৌচাগার অপরিচ্ছন্ন। লাইট নেই। দরজার লক নষ্ট। কোনোভাবে ব্যবহার করা যায় না।’
২৫০ শয্যার হাসপাতালে ১০০ শয্যার জনবলও নেই
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে চিকিৎসক প্রয়োজন ৫৮ জন। কিন্তু এই জনবলের অনুমোদন মেলেনি আজও। ১০০ শয্যার মঞ্জুরিকৃত ৪২ পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন ২৩ জন। একজন অ্যানেসথেসিস্ট ছাড়া সিনিয়র কনসালট্যান্টের ১০ পদের ৯টি শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১২ পদের পাঁচটি শূন্য। নেই চক্ষু চিকিৎসক ও প্যাথলজিস্ট।
১১ জন স্টাফ নার্সের বিপরীতে রয়েছেন পাঁচ জন। দ্বিতীয় শ্রেণির অনুমোদিত ১৬৯ পদের বিপরীতে ১৫টি, তৃতীয় শ্রেণির ৫২ পদের বিপরীতে ৩৭টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৮ পদের বিপরীতে ১৩টি শূন্য। মোট ২৯২ পদের বিপরীতে ৮৫টি পদ শূন্য রয়েছে। তবে এসব জনবল ১০০ শয্যার মঞ্জুরি মোতবেক। গত ছয় বছরেও ২৫০ শয্যার জনবল কাঠামোর অনুমোদন মেলেনি। ফলে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখনও কোনও সমাধান পাওয়া যায়নি।’
তবে শয্যা সংকট ও অপরিচ্ছন্নতাসহ অন্য সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনও কথা বলতে রাজি হননি তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক।