নামেই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, নানা সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার। অথচ হাসপাতালটি চলছে ১০০ শয্যার কম জনবল দিয়ে। এখানে নেই চক্ষু, সার্জারি বিশেষজ্ঞ। গাইনি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র একজন করে। নেই চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত ওষুধ। হাসপাতালে প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগী এলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।

হাসপাতালের রোগী, চিকিৎসক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে এই হাসপাতালের কার্যক্রম। এখানে রোগীদের জন্য শয্যা আছে ১৭০টি। বাকি ৮০টি না থাকায় মেঝে ও বারান্দায় সেবা নিচ্ছেন রোগীরা। এ ছাড়া রোগীদের বাড়ি থেকে আনতে হয় কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্র। শয্যার বিপরীতে প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ২০১৩ সালে পুরাতন ভবনের পাশেই নির্মিত হয় আরেকটি সাততলা ভবন। ২০১৯ সালে ভবনটি হস্তান্তরের কথা থাকলেও সিঁড়ি ও লিফট না থাকায় এখনও চালু করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে করে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন শত শত রোগী।

অপরদিকে, জনবল সংকটে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। রোগী অনুপাতে চিকিৎসক স্বল্পতা, বিছানা সংকট, ওষুধ সংকট, খাবার সরবরাহে অনিয়মসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা।

সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামের সহিদার রহমান বলেন, ‌‘১৯ অক্টোবর স্ত্রীর প্রসবব্যথা উঠলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের কারণে সেবা না পেয়ে ওই দিন রাত ১১টার দিকে পাশের একটি ক্লিনিকে নিয়ে সিজারিয়ান অপারেশন করানো হয়। এতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এখানে চিকিৎসা পেলে খরচ কম হতো। এটি নামেই ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। অথচ অনেক শয্যা নেই।’

একই উপজেলার দাড়োয়ানী সুতাকল এলাকার বেলাল হোসেনের স্ত্রী জবা আক্তার একদিনের নবজাতক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন দুদিন আগে। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডের ভেতরে রোগীদের জন্য প্রবেশ করা যায় না। বিছানাপত্র তো নেই, বাড়ি থেকে কাঁথা-বালিশ এনে বারান্দায় বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। রোগীদের অনেক কষ্ট। বাথরুমগুলোর অবস্থা বেহাল। নেই ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। নামেই জেনারেল হাসপাতাল।’

বুধবার বিকালে দুই মাসের শিশু সিহাবকে নিয়ে হাসপাতালে আসা মমতা বেগম বলেন, ‘বুকব্যথা, সর্দি-জ্বর ও কাশি নিয়ে দুদিন আগে শিশু ওয়ার্ডে সন্তানকে ভর্তি করি। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে বারান্দায় অনেক কষ্টে চিকিৎসা নিচ্ছি। ক্লিনিকে যাওয়ার জন্য আমাদের টাকা-পয়সা নেই। তাই এখানে পড়ে আছি।’

একই ওয়ার্ডে শিশু বিপাশাকে ভর্তি করা কণিকা রায় বলেন, ‘গত সাত দিন ধরে জ্বর-সর্দি, কাশি ও বুকব্যথার কারণে সন্তানকে নিয়ে ভর্তি হয়েছি। ভেতরে থাকার জায়গা নেই, বিছানাও নেই। বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। বাড়ি থেকে বিছানাপত্র এনেছি। ভেতেরে এক বিছানায় চার-পাঁচ শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও শয্যা আছে ১৭০টি। বাকি ৮০টি শয্যা অকেজো। চিকিৎসক ও বিছনা সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আরিফুজ্জামান বলেন, ‌‘১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও চিকিৎসক ও অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি এখনও। ২০১৩ সালে পাশেই একটি সাততলা ভবন নির্মিত হলেও এখনও চালু করা যায়নি। কারণ সিঁড়ি ও লিফট না থাকায় মুমূর্ষু রোগীদের সেখানে নেওয়া যাচ্ছে না। গণপূর্ত অধিদফতর আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সব কিছু ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেখানে গেলে রোগীদের ভোগান্তি থাকবে না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি আমরা।’

আরিফুজ্জামান জানান, প্রতিদিন ইনডোরে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগীকে সেবা দিতে হয়। এ ছাড়া আউটডোরে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ রোগী চিকিৎসা নেন। ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ১৪৩ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন ৪২ জন। অর্থাৎ ১০০ শয্যা হাসপাতালের জনবল দিয়ে কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, সার্জারি ও স্কিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই।