একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো

তিন সপ্তাহের ব্যবধানে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধে আবার ধস দেখা দিয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) রাতে উপজেলার কাঁচকোল এলাকায় নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধে তৃতীয় দফায় এ ধস দেখা দেয়। পূর্বের দুটি ধসের স্থলের ভাটিতে বাঁধের ৩০ মিটার অংশে নতুন করে ধস শুরু হওয়ায় তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সেইসঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার কাছাকাছি উচ্চতায় প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সন্ধ্যায় বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-নদের পানি সতর্কসীমায় পৌঁছে কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে।

পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানির উচ্চতা বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে এসময় নদের সবকটি পয়েন্টে পানির উচ্চতা স্থিতিশীল হয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। 
 
এদিকে ধস ঠেকাতে মঙ্গলবার সকাল থেকে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাঁধের অন্তত ৩০০ মিটার মারাত্মক ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে পাউবো।
 
এর আগে গত ১ জুলাই প্রথমবার এবং ১৬ জুলাই দ্বিতীয় দফায় তীর রক্ষা বাঁধে ধস দেখা দেয়। পরে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ধস ঠেকানোর উদ্যোগ নেয় পাউবো। আগের ধস ঠেকানোর চলমান প্রতিরক্ষা কাজ শেষ হওয়ায় আগেই কিছুটা ভাটিতে তৃতীয় দফায় ধস দেখা দিয়েছে। এতে করে চলতি বন্যা মৌসুমে বাঁধটির নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

তীর রক্ষা বাঁধে একের পর এক ধস দেখা দেওয়ার কারণ হিসেবে বাঁধের প্রতিরক্ষা কাজে নকশার দুর্বলতা এবং ব্রহ্মপুত্রের সম্ভাব্য চ্যানেল পরিবর্তন দায়ী বলে ধারণা করছে পাউবো। এ অবস্থায় জিও ব্যাগেই ভরসা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় ধস ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে পাউবো।
 
ব্র্রহ্মপুত্র পাড়ের বাসিন্দাদের দাবি, বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে ধসরোধে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে চলমান বন্যা মৌসুমে উপজেলা শহরসহ হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়তে পারে। শত শত হেক্টর আবাদি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আমনসহ স্থানীয় কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

পাউবো বলছে, তিন দফায় তীর রক্ষা বাঁধের ৯০ মিটার অংশে ধস দেখা দিয়েছে। বাঁধটির ওই স্থান বেশ দুর্বল কাঠামোর ওপর নির্মিত। ওই অংশে প্রায়ই ধস দেখা দেয়। তীর রক্ষা বাঁধের ধস শুরু হওয়ার খবরে জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং চলমান রাখা প্রয়োজন। ভাটিতে আরও অন্তত ৩০০ মিটার নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তবে পানির চাপে বাঁধটি একেবারে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দাবি করেছে পাউবো।

স্থানীয় লোকজন জানান, সোমবার রাতে তীর রক্ষা বাঁধে ফের তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। একের পর এক ব্লক ও জিও ব্যাগ ধসে যেতে থাকে। বড় অংশজুড়ে ধস ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে মাইকিং করে স্থানীয়দের বাঁধের পাড়ে ডাকা হয়। বাঁধ রক্ষায় রাতেই তীরে রাখা বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ধসের স্থানে ফেলে এলাকাবাসী। পরে সকালে পাউবোর লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করে। মূল ভাঙন এলাকা ছাড়াও এর উভয় দিকে বিভিন্ন স্থানে ব্লক স্থানচ্যুত হয়েছে। সেখানেও যেকোনো সময় ধস দেখা দিতে পারে। ঠেকাতে না পারলে শত শত পরিবার ব্রহ্মপুত্রের পানিতে ভেসে যেতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের পর আমরা নদীভাঙন থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বারবার ধসের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনও সমাধান দিতে পারেনি। বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সর্বস্ব হারিয়ে আবারও ভাঙন ও বন্যার কবলে পড়বো।’

বাঁধের পাড়ের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘একটার পর একটা ধস শুরু হইছে। কয়টা বালুর বস্তা ফেলে কোনও রকমে ঠেকায়। কী কাজ করে যে ফের ধস নামে। পোক্ত কাজ না করলে বাঁধও যাইবে, মানুষের বাড়িঘরও যাইবে।’

একের পর এক ধস দেখা দেওয়ার কারণ হিসেবে পাউবো বলছে, কাঁচকোল এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের তীররক্ষা বাঁধটি ২০১৬ সালে করা। বাঁধের ওই স্থানটির নকশা ও কাঠামোগত দূর্বলতা রয়েছে। তখন যে ডিজাইনে তীর সংরক্ষণ কাজ করা হয়েছে তাতে ডাম্পিংয়ে ব্লক ও জিও ব্যাগের ঘনত্ব কম ছিল। ফলে প্রায়ই ধস দেখা দেয়। আর তখন জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবছরও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ধস ঠেকাতে আপাতত জিও ব্যাগ ছাড়া বিকল্প কোনও ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছে পাউবো কর্তৃপক্ষ।

পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাঁধের ভাঙন এলাকায় জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করা হয়েছে। বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে স্থানটির ধস বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধস না ঠেকানো পর্যন্ত কাজ চলবে।’

তিনি বলেন, ‘আবার ধস দেখা দেওয়ায় ওই স্থানে তিন দফায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করে অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে। আর কী পরিমাণ জিও ব্যাগ লাগবে তা হিসাব করে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। আপাতত জিও ব্যাগ ফেলা ছাড়া বিকল্প প্রতিরক্ষা কাজের সুযোগ নেই।’