রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ওই অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া একটি বক্তব্যের তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ১১ জন সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুলকে ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বললেন তারা। পাশাপাশি এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে রংপুরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
কী বলেছিলেন মির্জা ফখরুল
গত রবিবার বেলা দেড়টার দিকে রংপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চ্যারিটি সংস্থা লাভ শেয়ার বিডি অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘সুবিধাবঞ্চিতদের স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্প’–এর উদ্বোধন এবং রংপুর অঞ্চলের ২৫ সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তির মধ্যে ২৫টি চা-ঘর হস্তান্তর করা হয়।
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বিরোধীদলের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের একটা বিরোধী দল আছে। এই বিরোধী দল দুর্ভাগ্যক্রমে আবার সেই আগের মতোই ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতো, এরাও ওই করতে দেবো না, চলতে দেবো না...ভাষাতেই কথা বলতেছে। এই সরকারের বয়স যে মাত্র চার-পাঁচ মাস এবং এই সময়ে যে সরকার অনেকগুলো কাজ করেছে, সেই কথা বলে না বিরোধীদল। হাসিনা যে ভাষায় কথা বলতো, বিরোধী দলও ওই ভাষাতেই কথা বলতেছে।’
রংপুর ও উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আরেকটি কথা বলেছেন যে তিনি এই রংপুর বিভাগ, উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে চান। যার ফলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, কাজ পাবো, বেকার থাকবো না।’
রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রংপুরের লোকেরা আমরা সব সময় পিছিয়ে পড়া। কেন পিছিয়ে পড়া? আমরা তো সঠিক জিনিসটাই বুঝি না। যখন বিএনপি গভর্নমেন্টে আসবে, তখন আপনারা করবেন জাতীয় পার্টি। যখন বিএনপি গভর্নমেন্টে আসবে, তখন আপনারা করবেন জামায়াত। তাহলে কেমনে হবে? পাবেন কেমনে?’
ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সামসুজ্জামান সামু, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ও লাভ শেয়ার বিডির পরিচালক জাহিদ খান প্রমুখ।
মির্জা ফখরুলকে বক্তব্য প্রত্যাহার করতে বললেন জামায়াতের ১১ এমপি
এরপরই তার বক্তব্যের শেষের অংশ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রংপুর নগরের জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানান রংপুরে জামায়াতের ১১ জন সংসদ সদস্য। তারা বলেছেন, রংপুরের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, সেটি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। উন্নয়নের সঙ্গে কোনও অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক পছন্দকে শর্তযুক্ত করা যাবে না।
এ সময় তারা উন্নয়নের জন্য ক্ষমতাসীন দলকেই ভোট দিতে হবে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি এবং একদলীয় শাসন কায়েমেরই নামান্তর বলেও মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলামের এই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য আবদুস সাত্তার, নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ, নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী ও নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম, গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল করিম, গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ও গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়ারেছ উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রংপুরের মানুষ বিএনপি ছাড়া অন্য কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করায় উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকে—এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘ওনার (মির্জা ফখরুল) মতো প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার এ ধরনের বক্তব্য সংবিধান ঘোষিত বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি ও মতামত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি, পাশাপাশি রংপুরবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের বিপক্ষে অসম্মানজনক।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম দায়িত্ব দেশের সব অঞ্চলের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা। সেই বিবেচনায় পিছিয়ে থাকা রংপুর অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে মন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা এই জনপদের মানুষ প্রত্যাশা করেন।
রংপুরের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে সংসদ সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশের কোনও নাগরিক বা কোনও অঞ্চলের মানুষ কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন, সেটি সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক অধিকার। জনগণের ভোট কোনও সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শর্ত হতে পারে না। সরকার ক্ষমতায় থাকবে জনগণের জন্য, জনগণের করের অর্থে এবং রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধানের ভিত্তিতে। ফলে কোনও অঞ্চলের মানুষ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করলে তাদের উন্নয়ন ব্যাহত হবে—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়।’
একই সঙ্গে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেন, রংপুরের উন্নয়ন কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার নয়। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রংপুরের মানুষ সমান অধিকার ও ন্যায্য উন্নয়নের দাবিদার। দলমত-নির্বিশেষে তাদের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ
এদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রতিবাদে রংপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে নগরের পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এটি সিটি বাজার, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, প্রেসক্লাব ও গ্র্যান্ড হোটেল মোড় ঘুরে শাপলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান। সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক (কাজল)। বক্তব্য দেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এনামুল হক।
সমাবেশে এ টি এম আজম খান বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে রংপুরের মানুষ বিএনপির পরিবর্তে জাতীয় পার্টি বা জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ায় এ অঞ্চল কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য রংপুরবাসীর রাজনৈতিক সচেতনতা, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবিধানিক অধিকারকে খাটো করে। কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়া হবে, সেটি জনগণের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। উন্নয়নের সঙ্গে রাজনৈতিক পছন্দের সম্পর্ক তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দল-মত নির্বিশেষে সব অঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।’
রংপুরের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান এ টি এম আজম খান।
সমাবেশ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে উন্নয়নকে যুক্ত না করে রংপুরের মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
বিক্ষোভ মিছিলে মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা এনামুল হক, অ্যাসাইনমেন্ট সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল গনি, কোতোয়ালি থানা আমির মাওলানা গোলাম কিবরিয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।