সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষকের সবাই অনুপস্থিত, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে অবস্থিত খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত না ক্লাসে আসায় বিক্ষোভ করেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে বিদ্যালয়ে গিয়ে সব কক্ষ বন্ধ পেয়ে তারা বিক্ষোভ করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না এবং ঠিকমতো পাঠদানও হয় না।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ব্রহ্মপুত্রের দ্বীপচর ঝুনকার চর গ্রামের এই স্কুলে কোনও শিক্ষক নিয়মিত যান না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একজন কিংবা দুজন শিক্ষক উপস্থিত থেকে দায়সারা শিক্ষকতা সেরে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু সোমবার সেই চিত্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন শিক্ষকরা। সহকারী শিক্ষক কিংবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কেউ স্কুলে যাননি। শ্রেণি কক্ষের তালা খোলা হয়নি, উত্তোলন করা হয়নি জাতীয় পতাকা।

সোমবার সকালে একে একে শিক্ষার্থীরা স্কুলে উপস্থিত হলেও স্কুলটি তালাবদ্ধ ছিল। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারেনি। বেলা গড়িয়ে দুপুর হলে শিক্ষার্থীরা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ে। চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। এলাকাবাসীর ভাষায়, শিশু শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সোমবার সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও স্কুলটি তালাবদ্ধ ছিল। কোনও শিক্ষক স্কুলে উপস্থিত হননি। শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি মিড ডে মিলের খাদ্যসামগ্রী বিতরণও করা হয়নি।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুলটিকে প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক আছেন পাঁচ জন। কিন্তু শিক্ষকরা নিয়মিত আসেন না। দিন ভাগ করে একেক দিন একেক জন শিক্ষক স্কুলে হাজিরা দেন। তাদের মধ্যে একজন সহকারী শিক্ষক কখনই স্কুলে আসেন না। স্কুলে কোনও হাজিরা খাতা নেই। মাসের পর মাস ধরে এভাবেই স্কুল চলছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা জানায়, মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে আমাদের দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন (দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা) শুরু হবে। কিন্তু আজ কোনও শিক্ষক বিদ্যালয়ে আসেন নাই। এমন করে অবহেলায় আমাদের স্কুল জীবন চলছে।

স্কুলটির পাশের বাড়ির বাসিন্দা ও সাবেক শিক্ষার্থী আল-আমিন বলেন, ‘আমি নিজেও এই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। এখন অনার্স পড়ছি। ২০১৬ সালে প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকে স্কুলটিতে আর পড়াশোনা হয় না। কোনও শিক্ষক নিয়মিত আসেন না। এমনিতে চরের যে অবস্থা, তার ওপর স্কুলের বাচ্চাদের এভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।’

সাবেক এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনও উন্নতি হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এবং সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এসে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতির পরিবর্তনও হয়নি। আর আজ তো স্কুল খোলাও হয়নি, কোনও শিক্ষকও আসেননি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে স্কুলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইশরাত জাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কলেজশিক্ষক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অবহেলা খুবই দুঃখজনক। কিছু শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে সরকার এবং দল চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে সব স্কুলে নজরদারি বাড়ানোর জন্য শিক্ষা বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোবাশ্বের আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সোমবার কোনও শিক্ষক স্কুলে যাননি। অনুপস্থিত থাকায় প্রত্যেক শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিসারদের ডেকে অভিযুক্ত সব শিক্ষককে শোকজ করতে নির্দেশ দিয়েছি। স্কুলে অনুপস্থিত থাকায় ওই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’