রংপুরে চার খুন: ডোপ টেস্ট নেগেটিভ নিয়ে যত প্রশ্ন

রংপুরের আলোচিত চার খুনের মামলার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসায় প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী। একইসঙ্গে গ্রেফতারের পর অভিযুক্তরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার আগে এবং পরে ইয়াবা সেবনের যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। এ নিয়ে চিকিৎসক ও পুলিশ বলছে, প্রস্রাবে মাদক সেবনের প্রমাণ থাকে সর্বোচ্চ সাত দিন। যেহেতু ঘটনার অষ্টম দিনে আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হয়েছে, সেহেতু প্রস্রাবে মাদকের নমুনা না পাওয়া স্বাভাবিক। 

পুলিশ এই ডোপ টেস্টের ফলাফল ঘোষণার পর দেশের শীর্ষ স্থানীয় মিডিয়াগুলো এ নিয়ে খবরে প্রস্রাবে মাদকের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়ে চিকিৎসক ও পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যাটুকু এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অনেকে।

যা বলছেন ডিবির উপপুলিশ কমিশনার

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আজ বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ বেলা আড়াইটার দিকে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। প্রতিবেদনে তাদের শরীরে মাদকের কোনও অস্তিত্ব নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার আট দিন পর আসামিদের মূত্রের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সাধারণত এত দিন পর মূত্রের পরীক্ষায় মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। দুই-তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করলে তা পাওয়া যেতো। এ ছাড়া রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডোপ টেস্টের জন্য মূত্র পরীক্ষা করা হয়। চুল বা রক্তের নমুনা পরীক্ষার সুযোগ নেই।’

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ইয়াবা বা এই জাতীয় মাদক সেবনের পর তা দুই থেকে তিন দিনের বেশি শরীরে বা মূত্রে স্থায়ী হয় না। ফলে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় ডোপ টেস্টে মাদকের (যেমন এমফিটামিন) উপস্থিতি না পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

আসামিরা ইয়াবা সেবন করে খুনের কথা স্বীকার করেছে বলছে পুলিশ 

পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের আগে আট থেকে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা নিজ মুখে স্বীকার করেছেন। কিন্তু যেহেতু আট দিন পর কেবল মূত্রের পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে (রংপুর মেডিক্যালে চুল বা রক্তের উন্নত পরীক্ষার সুযোগ না থাকায়), তাই ল্যাব রিপোর্টে তা ধরা পড়েনি। এ ছাড়া মামলার তদন্তে আসামিদের এক বন্ধু আদালতে জবানবন্দি দিয়ে জানিয়েছেন, ঘটনার রাতে আসামিরা তার বাড়িতেই ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এতেও বোঝা যায়, দেরিতে পরীক্ষা করায় মাদকের বিষয়টি ধরা পড়েনি। তার মানে এই নয় যে, আসামিরা খুনে জড়িত নয়।  

পুলিশের ভাষ্য, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই চার জনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে আদালতে আসামিরা হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। বর্তমানে আসামিরা রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।

গতকাল রবিবার রংপুর ডিবি পুলিশের সদস্যরা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন টেকনোলজিস্টকে সঙ্গে নিয়ে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে যান। সেখানে কারাগারের ভেতরেই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তাদের কারাগারের বাইরে এনে ডোপ টেস্ট করা হলে হামলা বা মব তৈরির আশঙ্কা থাকায় কারাগারের ভেতর থেকেই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডোপ টেস্টে মাদক না পাওয়ার বিষয়টি পুলিশের আগের বক্তব্য ও আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘সাংঘর্ষিক নয়। এতদিন পর প্রস্রাব পরীক্ষায় আগে সেবন করা মাদকের উপস্থিতি সাধারণত শনাক্ত হয় না। ফলে পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অভিযুক্তরা হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে মাদক সেবন করেননি। তবে তদন্ত তো চলছেই। আমরা বসে নেই। আরও তদন্ত করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চিকিৎসকরা বলছেন সাত দিনের বেশি প্রস্রাবে মাদক সেবনের প্রমাণ থাকে না

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘কারাগার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নয় দিনের মাথায় ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে। যারা মাদক সেবন করেন, তাদের প্রস্রাবে পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। আরও কম সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে ভালো হতো। সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করা হলে তারা মাদকে আসক্ত কিনা, তা বোঝা যেতো। পরীক্ষায় পজিটিভ পাওয়া যায়নি বলে তারা মাদকাসক্ত নন—এমনটা বলা যায় না। আবার এত দিন পর পরীক্ষা করায় তারা মাদকাসক্ত ছিলেন না, সেটিও বলা যাবে না।’

জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ

গ্রেফতার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশের করা তিন দিনের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। তবে মামলার তদন্তের স্বার্থে দুই আসামিকে দুই দিন জেলগেটে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকালে রংপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক রফিকুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

এর আগে চার খুনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক জিন্নাত আলী কারাগারে থাকা সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি আদালতকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কিনা এবং ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে আসামিদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।’ তবে আদালত তিন দিনের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে দুই আসামিকে দুই দিন জেলগেটে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

ডোপ টেস্ট নেগেটিভ আসায় প্রশ্ন

এদিকে হত্যা মামলার দুই আসামির ডোপ টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে—এমন খবর পাওয়ার পর সোমবার বিকালে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই ও মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী, নিহতের স্ত্রী প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তীসহ কয়েকজন স্বজন রংপুর মহানগর ডিবি কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা ডিবির উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানান।

পরে ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মামলার বাদী গোপীনাথ চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‌‘আসামিদের গ্রেফতারের পরপরই ডোপ টেস্ট করা উচিত ছিল। আট দিন পর ডোপ টেস্ট করায় এর ফলাফল নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আসলে তারা খুন করেছে কিনা, করলে কেন করেছে; এসব প্রশ্ন আছে আমাদের।’

গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘দুই দিন পর প্রস্রাবে মাদক সেবনের বিষয়টি ধরা পড়ে না—এটা কি সংশ্লিষ্টরা জানতেন না? আট দিন পর ডোপ টেস্ট করে কী হলো, কেন করা হলো; সেটাই আমাদের প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর মেডিক্যাল কলেজে প্রস্রাব ছাড়া চুল বা শরীরের অন্য অংশের নমুনা দিয়ে ডোপ টেস্ট করা হয় না—এমন কথাও আমরা শুনেছি। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’

গোপীনাথ চক্রবর্তী জানান, তারা কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং তারা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।

একই ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তীও। তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও কেউ জড়িত ছিল কিনা, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাত্র দুজনের পক্ষে পরিবারের চার জনকে হত্যা করা সম্ভব কিনা, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানাই আমরা।’

পুলিশ বলছে ওই দুজনই অভিযুক্ত

গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৩)। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে পরদিন ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর রবিবার বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়। তখন বলা হয় ওই দুই যুবকই হত্যায় জড়িত।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ২৩ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তারা দুজন গণপতির বাড়ির বাথরুমে গোসল করেন। পরে ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করেন।’

সবশেষ গত বৃহস্পতিবার রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ গ্রেফতার দুই আসামিকে মূল খুনি হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে দুটি সম্ভাব্য কারণও উল্লেখ করেছেন তিনি। ওই দিন সকাল ৯টায় তার কার্যালয়ে ডাকা এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। চার খুনের ঘটনায় জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও জাতদ্বন্দ্ব থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন।

পুলিশ জানায়, মামলার আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। বর্তমানে মামলাটি মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে।

তবে মামলার তদন্তে নতুন করে জেলগেটে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য বেরিয়ে আসে কিনা—এখন সেদিকেই নজর রয়েছে নিহতদের স্বজনদের।