কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আমনের ভরা মৌসুম আর রবির আগাম ফসলের জন্য চাহিদা তীব্র হলেও বাস্তবে সারের নাগাল পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
এ অবস্থায় কৃষকদের মাঝে হতাশা এবং ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ডিলারের গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা এবং আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কৃষি বিভাগ দাবি করছে, ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের মধ্যে প্রয়োজনের অধিক সার প্রয়োগের প্রবণতা বেশি। তারা অনুমোদিত মাত্রা এবং প্রযোজ্যতা অনুসরণ না করে জমিতে ইচ্ছেমতো অধিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করেন। ফলে বরাদ্দ ও চাহিদার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। একই সাথে মাটির অম্লত্ব বেড়ে উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে।
সরেজমিন উপজেলাটিতে কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে বেশ দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। ক্রান্তিলগ্নেও সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন কিংবা প্রয়োগমাত্রা নিয়ে কোনও পরামর্শ পান না বলে অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা ব্লক সুপারভাইজারদের (বিএস) তারা মাঠে পান না। ফসলে কোন কীটনাশক এবং সার কখন কী পরিমাণে দিতে হবে সে বিষয়ে সরকারি কোনো পরামর্শ পান না। এ অবস্থায় সারের প্রয়োগ ও ফসলের যত্নের বিষয়ে তারা নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও প্রাকৃতিক জ্ঞান ব্যবহার করছেন। চারা গাছের মেজাজ বুঝে সার কিংবা কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।
সার ও কৃষি পরামর্শ থেকে বঞ্চিত কৃষক
গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভূরুঙ্গামারী উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে ঘুরে বেশ কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। সেখানে দেখা গেছে, কৃষকরা সারের জন্য বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে ছোটাছুটি করছেন। সার না পেয়ে ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
তাদের অভিযোগ, জমিতে সার প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দিলেও তারা পাচ্ছেন না। পেলেও চাহিদার অনেক কম। সারের অভাবে আমন ও আগাম সবজি চাষ বিঘ্নিত হচ্ছে। সার প্রাপ্তিতে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও আছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় উপজেলার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ক্যাম্প মোড়ে মেসার্স জনার্দ্দন চন্দ্র সাহা নামে বিসিআইসির ডিলার পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আসা কৃষকদের মাঝে সার নিয়ে উৎকন্ঠা। ৩ থেকে ৫ জন কৃষক মিলে ১ বস্তা ডিএপি সার পাচ্ছেন। ইউরিয়ার মজুত পর্যাপ্ত না থাকায় দেওয়া বন্ধ।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের আমন ক্ষেত চাষের বয়স প্রায় দেড় থেকে পৌনে দুই মাস। তাতে ডিএপি সার প্রয়োগ করবেন। কিন্তু কৃষি বিভাগ বলছে, আমনের এই বয়সে ডিএপি সারের প্রয়োজন নেই। প্রয়োগ করলে তা কোনো কাজে আসবে না, অপচয় হবে।
সার নেওয়া কৃষক মোহাম্মদ আলী ও আব্দুল আজিজ জানান, এই বয়সের ধান ক্ষেতে যে ডিএপি দেওয়ার প্রয়োজন নেই তা তারা জানেন না। কেউ তাদের সে বার্তা দেয়নি। ইউরিয়া না পাওয়ায় জমিতে ডিএপি সার দিচ্ছেন।
ইউনিয়নের বানুরকুটি গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন,‘দুই বিঘা জমি। ওয়া ( ধানের চারা) দেখলে মাথা নষ্ট হয়া যায়। বয়স দেড় মাস পার হইছে। ইউরিয়া পাই নাই। সেজন্যে ডিএপি দিমো। না দিয়া কী করমো। আরতো কোনো বুদ্ধি নাই। মনের আবেগে দিতেছি। ধানবাড়ি দেখলে মনটা খারাপ হয়।’
কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমরা কেমনে জানমু কোন সার কখন দেওয়া লাগে বা লাগে না। গাছের অবস্থা দেইখা সার দেই। ডিএপি দিলে রঙ ধরে। এজন্য দিই।’
ডিলারের প্রতিনিধি আবুল হাসেম বলেন, ‘এই ইউনিয়নে কৃষকরা চরে শত শত বিঘা জমিতে বেগুন চাষ শুরু করছে। সারের খুব চাহিদা। বেগুনের জন্য যে পরিমাণ সার লাগে সে সার পাচ্ছিনা।’
মাঠে কৃষকের পাশে নেই বিএস
দুধকুমার নদের গুনাইয়েরকুটি চরে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক শত বিঘা জমিতে রবি মৌসুমের আগাম বেগুন চাষ শুরু করেছেন। কেউ কীটনাশক দিচ্ছেন। কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হয়।
তাদের অভিযোগ, চাষের এই সময় ইউরিয়া ও ডিএপি সারের প্রয়োজন পড়লেও তারা নাগাল পাচ্ছেন না। পরামর্শ প্রয়োজন হলেও কৃষি বিভাগের কারও দেখা মিলছে না। তারা মাঠে আসেন না। কিছু কোম্পানির লোকজন মাঠে আসেন। তাদের পরামর্শ নিয়ে চাষাবাদ করেন ওই কৃষকরা।
ওই চরের বেগুন চাষি হৃদয় মোল্লা বলেন, ‘চার বিঘা জমিতে বেগুন লাগাইছি। চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া, ডিএপি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে জমিতে জৈব সার ও ম্যাগনেসিয়াম মিলায় দিচ্ছি। বিএসরা তো মাঠে আসে না। গাছের ধরণ দেখে সার দেই।’
রমজান আলী নামে আরেক কৃষক বেগুন খেতে কীটনাশক দিচ্ছিলেন। সার নিয়ে তারও আক্ষেপ। এই কৃষক বলেন, ‘সারও পাই না, পরামর্শও পাই না। এহানে কোনো বিএস আহে না। নিজেদের জ্ঞানে জমিতে সার-কীটনাশক দেই।’
কৃষি বিভাগের ভাষ্য
সরকারি কৃষি বিভাগের সাথে কৃষকদের দূরত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তবে জনবল সংকটের কারণে সকল কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের মধ্যে অধিক পরিমাণে সার প্রয়োগের প্রবণতা রয়েছে। প্রয়োজন না থাকলেও অনেক কৃষক সারের জন্য ঘুরছেন। তারা মাত্রা মেনে সার প্রয়োগ করেন না। আমন খেতে এখন ডিএপি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। দিলে সেটা অপচয় হবে। এই মাসের ২০ তারিখের পর ইউরিয়া দেওয়ারও প্রয়োজন থাকবে না। অনেকে ইউরিয়ার পরিবর্তে ডিএপি দেন।’
কৃষকদের পরামর্শ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তার (বিএস) যত কাজ তাতে মাঠে না গিয়ে উপায় নেই। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হয়। মাঠদিবসসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। একটা ইউনিয়নে অনেক কৃষক। আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। ফলে সকলের কাছে হয়তো পৌঁছনো সম্ভব হয় না। তবে প্রত্যেক ইউনিয়ন পরিষদে বিএস বসেন। কৃষকরা যেকোনো প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে পরামর্শ নিতে পারেন।’
কৃষকদের চাহিদার কথা বিবেচনায় ভূরুঙ্গামারী উপজেলার জন্য নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে আরও ৩০০ টন ইউরিয়া এবং ৩০০ টন ডিএপি সার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।