৪৫ বছর পর স্বীকৃতি, বীরাঙ্গনা ফুলমতির শেষ বিদায় লাল-সবুজের পতাকায়

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্যাতনের শিকার গাইবান্ধার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় শয্যাশায়ী থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার হয়েও সাহস ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে জীবন কাটিয়েছেন ফুলমতি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর ২০১৬ সালে নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান তিনি।

সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের ভূমি অফিসের সামনে সড়কের পাশে সরকারি খাসজমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন ফুলমতি। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে নির্মিত ‘বীর নিবাসে’ ওঠেন তিনি। জীবনের শেষ সময়টাও সেই বাড়িতেই কেটেছে তার।

স্বজনরা জানান, সাদুল্লাপুর উপজেলা সদরের উত্তরপাড়া গ্রামের ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে প্যারালাইসিস, ব্রেন স্ট্রোকসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তার চলাফেরার সক্ষমতা কমে যায়। শেষ দিকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। নিজ বাড়িতেই চলছিল তার চিকিৎসা। শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মারা যান তিনি।

ফুলমতির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ছেলে মনিরাজ কুমার। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মায়ের শারীরিক অবস্থা ভালো ছিলো না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর তিনি মারা যান।’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বিকাল ৩টায় নিজ বাড়িতে ফুলমতির শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিকে সাদুল্লাপুরের উত্তরপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। তখন তার বয়স ছিল আনুমানিক ২৮ বছর।

স্বাধীনতার পর বহু মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেও ফুলমতির স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তার স্বীকৃতির জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন করা হয়। অবশেষে ২০১৬ সালের মার্চে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান তিনি।

এরপর ২০১৭ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে তার জন্য চার কক্ষবিশিষ্ট একটি ‘বীর নিবাস’ নির্মাণ করা হয়। জীবনের শেষ সময়ে সেই বাড়িতেই শয্যাশায়ী ছিলেন ফুলমতি। তার স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া ১৯৮৮ সালে মারা যান। স্বামীকে হারানোর পর পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। পরে এক ছেলে ও এক মেয়ের মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, অভাব-অনটনের সংসারে বড় ছেলে রতন কুমার ও নিরঞ্জন কুমার কখনও জুতা সেলাই, কখনও দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন। ছেলে সুজন কুমার সরকারি দফতরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। আরেক ছেলে মনিরাজ কুমার ২০১৭ সালে রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন। বর্তমানে বাড়ির সামনে কম্পিউটারের মাধ্যমে ভূমিসেবা ও অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন কাজ করেন। ফুলমতির ছেলে রতন কুমার এখনও জুতা সেলাইয়ের সঙ্গে যুক্ত। স্ত্রী, দুই ছেলে ও কলেজপড়ুয়া এক মেয়েকে নিয়ে তার সংসার।

ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তার স্বীকৃতি মেলে।’

তিনি বলেন, ‘শেষ জীবনে ফুলমতি নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। তার চিকিৎসার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী। উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে হয়তো তিনি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’

এদিকে ফুলমতির মৃত্যুতে সাদুল্লাপুর উপজেলা ও জেলার মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফুলমতি শুধু একজন নারী নন, তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার জীবনের নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোছা. মাহাবুবা বেগম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনা ফুলমতির আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তার স্মৃতি ধরে রাখতে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা প্রয়োজন।’

স্থানীয়দের দাবি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায়ের পাশাপাশি বীরাঙ্গনা ফুলমতির স্মৃতি সংরক্ষণে তার সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হোক। এতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, স্বাধীনতার পেছনে শুধু রণাঙ্গনের অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধারাই নন, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করা অসংখ্য নারীর আত্মত্যাগও জড়িয়ে আছে।

লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায় নেবেন বীরাঙ্গনা ফুলমতি। তবে তার আত্মত্যাগ, নির্যাতন ও সংগ্রামের ইতিহাস রয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে।