দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ মাঠ খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ-রেলপথে অবস্থান ও আলটিমেটাম

দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ বড়মাঠ থেকে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ও তারকাঁটার বেড়া অপসারণ করে মাঠটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ-মানববন্ধন এবং রেলপথে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয় লোকজন। প্রায় এক বছর ধরে মাঠটিতে খেলাধুলাসহ সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এই আন্দোলনে নেমেছেন তারা। এ সময় মাঠটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানানোর পাশাপাশি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। 

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের সড়কে ‘বড় মাঠ রক্ষা কমিটি’র ব্যানারে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত দিনাজপুর পৌরসভা ও কাচারি গেটের মাঝামাঝি রেলগেট এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। এতে জেলার বিভিন্ন বয়সী খেলোয়াড়, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার হাজারো মানুষ অংশ নেয়।

দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রেহাতুল ইসলামের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বড় মাঠ রক্ষা কমিটির নেতা গোলাম নবী দুলাল। এতে বক্তব্য দেন দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোসাদ্দেক হোসেন, জেলা বিএনপির সহসভাপতি খালেকুজ্জামান ও আকতারুজ্জামান জুয়েল, জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মেহেরুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জেলা নাট্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান এবং জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য স্বাধীন সরকার প্রমুখ।

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে মাঠ উন্মুক্ত করার দাবিতে স্লোগান দেন। ব্যানারে লেখা ছিল, ‘ধর্ম, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে ভরপুর গোর-এ-শহীদ বড় মাঠ দিনাজপুরবাসীকে ফিরিয়ে দাও’, ‘এই মাঠ খেলাধুলা ও সবার জন্য উন্মুক্ত চাই’, ‘আমি কিশোর, আমি বড় মাঠে খেলতে চাই’ এবং ‘ক্রিকেট খেলার মাঠ অবিলম্বে অবমুক্ত করতে হবে’। প্রায় এক ঘণ্টা মানববন্ধন শেষে দিনাজপুর পৌরসভার পাশের রেললাইনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।

মানববন্ধনে গোর-এ-শহীদ বড় মাঠের গুরুত্ব তুলে ধরেন বক্তারা। তারা জানান, এটি দেশের সর্ববৃহৎ ঈদগাহ ময়দান। এখানে ঈদের জামাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, বাণিজ্য মেলা, বিজ্ঞান মেলা, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন হয়। ডায়াবেটিসের রোগীসহ সাধারণ মানুষ হাঁটাচলা ও নির্মল বিনোদনের জন্যও মাঠটি ব্যবহার করেন। দিনাজপুরবাসীর কাছে মাঠটি শুধু একটি খেলার জায়গা নয়; বরং শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বড় মাঠ রক্ষা কমিটির নেতা রেহাতুল ইসলাম বলেন, শত বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী এই মাঠ ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মেলবন্ধন। মাঠের মালিকানা যারই থাকুক, কোনোভাবেই এখানে খেলাধুলা বন্ধ করা উচিত নয়।

দিনাজপুর জেলা ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় জাকারিয়া বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়েরাও এই মাঠে অনুশীলন করতেন। এখন খেলাধুলা বন্ধ। আমরা বলেছি, মাঠের মালিকানা নিয়ে আপনারা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিন। কিন্তু মাঠে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা কোনোভাবেই দিনাজপুরবাসী মেনে নেবে না।’

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শুরুতে মাঠ সংস্কারের কথা বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়। পরে নির্বাচনী কার্যক্রমের জন্য দিনাজপুর স্পোর্টস ভিলেজে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে মাঠটি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়। এর ফলে প্রায় এক বছর ধরে মাঠটিতে সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মাঠটি উন্মুক্ত করার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়াসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্রুত মাঠটি উন্মুক্ত করা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

এ বিষয়ে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাম্প করেছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে স্থানীয় লোকজন আগের মতো মাঠ ব্যবহারের দাবিতে মানববন্ধন করেন। আজকেও স্থানীয়রা কর্মসূচি পালন করেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে আজকে কোনও স্মারকলিপি দেয়নি। বিগত সময়ে স্মারকলিপি দিয়েছিল। সেটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’