সুনামগঞ্জে ভূমিহীন পরিবারকে এক মাস ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ

রাধাকান্ত চৌধুরী ও তার পরিবারসুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য এক ভূমিহীন পরিবারকে এক মাস ধরে একঘরে করে রেখেছে গ্রাম্য সমাজপতিরা। গত ১৭ জুন রাতে উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের খাগাউড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

একঘরে হওয়া রাধাকান্ত চৌধুরী জানান, সম্প্রতি তিনি ও স্থানীয় রাদেশ তালুকদার মিলে সিলেটের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারিতে পাথর পরিবহনের জন্য যৌথ পুঁজি বিনিয়োগ করে একটি পাথরবাহী নৌকা তৈরি করেন। ওই সময় রাদেশের কাছ থেকে তিনি পাঁচ হাজার টাকা ধার করেন। আয়-রোজগার করে পাওনা টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সীমান্তের ওপাড় থেকে আকস্মিকভাবে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নৌকাটি ভেঙে গেলে দুজনই ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরে গ্রামের বাড়িতে এসে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য রাদেশ গ্রাম্য সালিশ ডাকেন।

রাধাকান্ত আরও জানান,গত ১৭ জুন রাত ১১টায় মেশিনহাটির দোলন ভৌমিকের বাড়িতে সালিশ বৈঠক বসে। সালিশে তিনি কিস্তিতে টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিলেও গ্রাম্য সমাজপতি ও রাদেশ মানতে রাজি হননি।পরে রফিনগনর ইউনিয়ের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য চন্দন মজুমদার,স্থানীয় যোগেশ তালুকদার, শৈলেন তালুকদার, শীতল তালুকদারসহ আরও ১০ জন গ্রাম্য সমাজপতি তাকে ও তার পরিবারকে একঘরে রাখার রায় ঘোষণা করেন। সমাজপতিরা তার ও পরিবারের সদস্যদের সরকারি সড়কে আসা-যাওয়া, সরকারি টিউবওয়েলের পানি খাওয়া,ঘর থেকে বাইরে যাওয়া বন্ধ, গ্রাম্য হাটবাজারে সদাই বন্ধ করাসহ বেশ কয়েকটি  অমানবিক শর্ত দেন। এছাড়াও বিচারিক রায় কার্যকর করতে সালিশ বৈঠক আহ্বানকারী রাদেশ,জীতেন,অনিরুদ্ধ ও রাতুলকে পরিবারটির উপর নজরদারি করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, একঘরে করে রাখার ফলে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সার্বক্ষণিক পরিবারের প্রতিটি সদস্যের উপর কঠোর নজরদারি করায় তিনি উপজেলা সদর দিরাইয়ে গিয়ে থানায় অভিযোগও করতে পারছেন না।

রাধাকান্তের স্ত্রী প্রতিভা চৌধুরী জানান, সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখায় তারা গৃহবন্দি অবস্থায় দিনযাপন করছেন। বসতঘর ও নিজের বাড়ির সীমানা পেরুলেই তাদেরকে বাধা নিষেধ দিচ্ছেন সমাজপতিদের নিয়োজিত লোকজন। অসুস্থ হওয়ার পরও ডাক্তার দেখাতে যেতে পারছেন না তিনি। কারণ গ্রাম্য বাজারে যাওয়ার ফেরি নৌকাগুলো তাদের পরিবারের কোনও সদস্যদের বহন করে না। এ রুটে চলাচলকারী সব নৌকার মাঝিকে তাদের নৌকায় না ওঠানোর নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন সমাজপতিরা।

এছাড়া রাধাকান্ত চৌধুরীর মেয়েদের স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে।বড় মেয়ে রফিনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী চায়না চৌধুরী জানায়, অন্য মেয়েদের নিয়ে নৌকার মাঝিরা স্কুলে গেলেও তাকে নৌকায় উঠতে দেওয়া হয় না।

ছোট মেয়ে খাগাউড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী প্রিয়া চৌধুরী জানায়, তারা রান্নাবান্নাসহ ঘর-গৃহস্থালীর কাজে বাড়ির পাশে ডোবার পানি ব্যবহার করছে। কারণ সরকারি টিউবওয়েলে পানি আনতে সমাজপতিরা বাধা দেয়।

এ ব্যাপারে ইউপি সদস্য চন্দন মজুমদার জানান, সালিশ বৈঠকে সমাজপতিদের রায় না মানায় রাধাকান্ত ও তার পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।  সালিশে গ্রামের সব মাতবর উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিসুল হক জানান, তিনি সোমবার ( ১৮ জুলাই) ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন। ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি অভিযোগ না দেওয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

কেন অভিযোগ দেননি এমন প্রশ্নের জবাবে মঙ্গলবার দুপুরে মোবাইলে রাধাকান্ত চৌধুরী বলেন, বিষয়টি সামাজিকভাবে মিমাংসার জন্য সমাজপতিরা তিনদিন সময় নিয়েছেন। তাই আপাতত অভিযোগ করেননি।

আরও পড়ুন:

‘কেমন করি বাঁচি থাকবো জানি না’

/বিটি/