চার মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ

আন্দোলনে যাচ্ছেন বৈকুণ্ঠিপুর চা বাগানের শ্রমিকরা

Habiganj tea leaver Special Story Pic 8 (1)বেতন-ভাতার দাবিতে বৃহস্পতিবার মহাসড়ক অবরোধসহ  আন্দোলনে যাচ্ছেন হবিগঞ্জের বৈকুণ্ঠিপুর চা বাগানের শ্রমিকরা। মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন তারা। তবে শ্রমিকদের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা গেছে।

সরেজমিনে হবিগঞ্জের বৈকুণ্ঠিপুর চা বাগানে গিয়ে জানা যায়,ওই চা বাগানে কাজ করেন ৪১৫ জন শ্রমিক ।গত ১৫ সপ্তাহ ধরে বাগান ম্যানেজার ও দুই কর্মকর্তা লাপাত্তা। কিন্তু শ্রমিকরা বাগানে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলেও মজুরি ও রেশন পাচ্ছেন না।। গত চার মাস ধরে বেতন, রেশন ও চিকিৎসা সেবা  না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন শ্রমিকরা। ইতোমধ্যে শ্রমিক ও স্টাফসহ ছয়জন বিনা চিকিৎসা ও অনাহারে মারা গেছেন।  এতে ফুঁসে উঠছেন বাগানের শ্রমিকরা। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জেলার মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৯শ’ ৫৫ একর ভূমি নিয়ে বৈকুণ্ঠি চা বাগান। এ বাগানে ৪১৫ জন শ্রমিক ও আটজন স্টাফ নিয়ে চা উৎপাদনের কাজ চলছিল। গত চার মাস ধরে বাগান মালিকের অব্যবস্থাপনার কারণে শ্রমিক ও স্টাফরা নিয়মিত মজুরি, রেশন ও ওষুধ পাচ্ছেন না।

চা শ্রমিকরা জানান, শ্রমিক প্রবিডেন্ট ফান্ডের ২৪ মাসের ২৫ লাখ ৫৬ হাজার ২৯ টাকা মালিক পক্ষ আত্মসাৎ করেছে। চার মাসের স্টাফ বেতন ৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৫ টাকা, শ্রমিকদের মজুরি ৩৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, হাজিরা বোনাস ২০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধ না করেই মুখার্জী কোম্পানির (বৈকুণ্ঠি চা বাগান) ম্যানেজার শাহজাহান ভূইয়া লাপাত্তা। শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, বোনাস, রেশন না পেয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন। গত ১৪ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাওসহ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৬ আগস্ট মানববাধিকার কমিশনের সদস্য নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম বাগানে এসে শ্রমিক-প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

Habiganj tea leaver Special Story Pic 2বাগানের অন্তঃসত্ত্বা নারী শ্রমিক কামিনী জানান, বেতন ভাতা না পাওয়ায় আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। আগামীতে আমার সন্তান আসছে। কিন্তু টাকার অভাবে সেই সন্তান সুস্থভাবে ভূমিষ্ট হবে কিনা তাই নিয়ে চিন্তায় আছি।

চা শ্রমিক নীলা শিল বলেন, চার মাস ধরে বেতন ভাতা ও চিকিৎসা না পাওয়ায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। পড়ালেখাও বন্ধ।

একই বাগানের শ্রমিক পলাশ চৌহান জানান, বেতন না পাওয়ায় বিনা চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ছয়জন মারা গেছেন।

বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম আজ  বুধবার শেষ হবে।  আজকের মধ্যে বেতন ভাতা পরিশোধ না হলে বৈকুণ্ঠিপুর চা বাগানের শ্রমিকরা আন্দোলনে নামবে। পরবর্তীতে লস্করপুর ভ্যালির ২৩ চা বাগানের শ্রমিকরা একসঙ্গে কাজ বন্ধ করে দেবে। এরপরও  যদি দাবি আদায় না হয়, তাহলে সারাদেশের ১৫৮টি বাগানের শ্রমিকরা একযোগে ধর্মঘটে নামবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রামভজন কৈড়ি জানান, বেতন ভাতার জন্য শ্রমিকদের আন্দোলনে তাদের সমর্থন আছে। তবে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম জানান, যতদিন শ্রমিকরা তাদের বেতন-ভাতা পাচ্ছে না, ততোদিন সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে রেশন দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান,বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথমে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে, পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মানবাধিকার কমিশনের সিলেট বিভাগীয় প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। এতদিন যাবত শ্রমিকদের বেতনভাতা না দেওয়ায় আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মালিকপক্ষকে হাজির করা হবে। বক্তব্য শুনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে মানবাধিকার কমিশন।

এদিকে, এতদিন লাপাত্তা থাকলেও মানবাধিকার কমিশনের ওই সভায় হাজির হন বৈকুণ্ঠি চা বাগানের ম্যানেজার শাহজাহান ভূইয়া। তিনি বলেন, মালিক পক্ষ ব্যাংক থেকে লোন নিতে না পারায় শ্রমিকদের বেতন ভাতা দিচ্ছে পারছে না। তবে মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। শীঘ্রই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে।

আরও পড়ুন:
সিরিজ বোমা হামলার ১১ বছর: উত্থান ঘটেছে নব্য জেএমবির

/বিটি/এপিএইচ/