বৃহস্পতিবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে সিলেট মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরো এ রায় দেয়। এসময় আদালতের কাঠগড়ায় রাগিব আলী ও তার ছেলে আবদুল হাই উপস্থিত ছিলেন। রাগীব আলীসহ পাঁচ কারাদণ্ডপ্রপ্ত আসামিকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, মামলার রায় ঘোষণার সময় প্রথমে আব্দুল হাইকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। এরপর আদালতের নির্দেশে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে রাগীব আলীকে পুলিশি পাহারায় নিয়ে আসা হয়। জানা গেছে, রাগীব আলীকে সময়মতো আদালতে না আনায় বিচারক সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ছগির আলীকে শোকজ করবেন। এ ঘটনার জন্য তার লিখিত বক্তব্য চাওয়া হবে।
সিলেটের পিপি অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ জানান, সরকারের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় রাগীব আলীর ১৪ বছর ও মামলার অন্য চার আসামিকে ১৬ বছর করে কারাদণ্ড দেন আদালত। আসামিদের চারটি ধারায় এ দণ্ড প্রদান করা হয় বলে জানান তিনি।
আদালতের সহকারী পিপি অ্যাডভোকেট মাহফুজুর রহমান বলেন, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এই মামলার বিচার শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। কিন্তু মামলায় অভিযুক্ত রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইয়ের মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণ দেখানোয় রায় ঘোষণা পিছিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, ৩০ মার্চের মধ্যে আবদুল হাইয়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিলে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসককে নির্দেশ দেন আদালত। গত ২ এপ্রিল আদালতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, তার স্বাস্থ্যগত মানসিক সমস্যা ধরা পড়েনি। প্রতিবেদন দাখিলের পর পরই উচ্চ আদালতের নির্দেশে আদালত স্থগিত করা রায় ঘোষণার নতুন দিন ৬ এপ্রিল ধার্য করেন বলেও জানান সরকারি এই কৌঁসুলী।
আদালত সূত্র জানায়, সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে ৩০ মার্চের মধ্যে আবদুল হাইয়ের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। গত ৩০ মার্চ মামলার ধার্য তারিখে এ প্রতিবেদন দাখিল না করায় মহানগর মুখ্য বিচারিক হাকিম এক আদেশে হাসপাতালের পরিচালককে পাঁচদিনের মধ্যে কারণ জানাতে বলেন। এ আদেশের তিনদিনের মাথায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে আবদুল হাইয়ের মানিসক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় মানসিক কোনও সমস্যা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্বাস্থ্যগত অন্য কোনো সমস্যাও নেই। এ ছাড়া প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনালেন এ কে মাহবুবুল হক লিখিত একটি ব্যাখা উপপরিচালক দেবপদ রায়ের আদালতে দাখিল করেন। এতে স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে সিলেটে গত ২৫ মার্চ জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চলাকালে বোমা হামলায় হতাহতদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, ২০০৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসএম আবদুল কাদের বাদী হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক জালিয়াতি ও সরকারের হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুটি মামলা করেন সিলেটের কোতোয়ালি থানায়। উচ্চ আদালতের নির্দেশে এ দুটি মামলার নতুন করে তদন্ত শেষে সিলেটের মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়। এরমধ্যে গত ২ ফেব্রুয়ারি জালিয়াতির মামলায় রাগীব আলী ও ছেলে আবদুল হাইয়ের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দেন মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম আদালত। আত্মসাৎ মামলায় রাগীব আলী, ছেলে আবদুল হাই, মেয়ে রোজিনা কাদির ও তার স্বামী আবদুল কাদির, তারাপুর চা-বাগানের ভুয়া সেবায়েত সাজা রাগীব আলীর আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ, সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্ত আসামি। এরমধ্যে মেয়ে ও তার স্বামী পলাতক, মোস্তাক ও পঙ্কজ জামিনে রয়েছেন। গত বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ একটি বেঞ্চ রায়ে মামলা দুটি পুনরুজ্জীবিত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এছাড়াও গত বছরের ২২ মার্চ সরকারি কৌঁসুলির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত করে পুলিশের বিশেষায়িত শাখা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১০ জুলাই অভিযোগপত্র দাখিল করে। ১২ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে গ্রেফতানি পরোয়ানা জারি হয়। ওই দিন বিকেলে সিলেটের জকিগঞ্জ ইমিগ্রেশন হয়ে পালিয়ে ভারতের করিমগঞ্জ চলে গিয়েছিলেন ছেলেসহ রাগীব আলী। ২৩ নভেম্বর ভারতের করিমগঞ্জ ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে রাগীব আলী এবং এর আগে ১২ নভেম্বর ভারত থেকে জকিগঞ্জ এসে আবদুল হাই গ্রেফতার হন।
/এফএস/
আরও পড়ুন-
গণপরিবহনশূণ্য ঢাকা