হাওর বেষ্টিত চার জেলায় কজওয়ে নির্মাণ করতে চায় পাউবো

ছবি: সংগৃহীতহাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন,আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে জেলায় বিভিন্ন হাওরে কজওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার চারটি সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় কজওয়ে নির্মাণের প্রস্তাবনা দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
সুনামগঞ্জে ১২১, হবিগঞ্জে ১১, নেত্রকোনায় ২৫ ও কিশোরগঞ্জে ১৯ সর্বমোট চার জেলায় ১৭৬টি কজওয়ে এবং ১৭ দশমিক ৬০০ কিলোমিটার সংযোগ বাঁধের স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আর এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯১৪ কোটি ৬২ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
হাওরে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে ৯৫টি, হবিগঞ্জে ১৪টি, নেত্রকোনায় ১৪টি ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ৯৭টি ছোটবড় হাওর রয়েছে। এসব হাওরের মধ্যে সুনামগঞ্জের ৩৭টি, হবিগঞ্জের ৩টি, নেত্রকোনার ৬টি ও কিশোরগঞ্জের ১৬টি হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নৌযান চলাচলে সুবিধায় সুনামগঞ্জ জেলার সদর, বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও জগন্নাথপুরসহ ৯টি উপজেলার হাওরে ১২১টি কজওয়ে নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে পাউবো।
হাওর এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত ও সীমান্তবর্তী আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আগাম বন্যার সময় বিভিন্ন হাওরের নদী সংলগ্ন ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত ও নির্মাণ করতে দেখা দেয় মাটি সংকট। ফলে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে দূরবর্তী এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করতে হয়। এতে বাঁধ পুনরায় নির্মাণে সময় বেশি লাগে। যার কারণে হাওরের বোরো ফসল আগাম বন্যার ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাছাড়া বর্ষায় হাওর এলাকায় নৌযান চলাচলে বাঁধের কোনও কোনও অংশ কেটে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য কজওয়ে নির্মাণ হলে হাওরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নৌযান চলাচল সুগম হবে এবং বাঁধ কাটার প্রবণতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপশি নির্মাণ ব্যয় কমে আসবে। এছাড়া কজওয়ে (শুষ্ক মৌসুম) তৈরি হলে হাওরে আগাম বন্যার পানি প্রবেশ রোধ করে ফসলহানি ঠেকানো সম্ভব হবে।
তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের বড়দল গ্রামের মাতিয়ান হাওরের কৃষক জমির হোসেন জানান, কজওয়ে নির্মাণ হলে লাখ লাখ কৃষক নিরাপদে বোরো আবাদ করতে পারবে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী পানি নিষ্কাশন ও প্রবেশ করানো যাবে। এটি হওয়া মানে কৃষকের জন্য সুখবর।
জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী গ্রামের কৃষক আনফর মিয়া জানান, কজওয়ে নির্মাণ হলে জাঙ্গালের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে। হাওরের ফসল আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে।
শাল্লা উপজেলা মনুয়া গ্রামের মৎস্যজীবী কঙ্কন জলদাস বলেন, কজওয়ে হলে মাছের প্রজননের সময় কোনও বাধা থাকবে না। জলাশয়ের মাছ নিরাপদে হাওর থেকে নদীতে চলাচল করতে পারবে। এতে মাছের উৎপদন বাড়বে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন, ‘কজওয়ে হাওরবান্ধব অবকাঠামো। যেটি রেগুলেটারের মতো কিন্তু কজওয়ের কোনও গেট থাকবে না। শুষ্ক মৌসুমে অস্থায়ীভাবে আটকানো ও বর্ষা মৌসুমে উন্মুক্ত থাকবে। এতে হাওরের পানি, নৌযান ও মাছের চলাচলে কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।ছবি: সংগৃহীত
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক বশির আহমদ সরকার বলেন, ‘হাওরে কজওয়ে নির্মাণ হলে হাওর এলাকার কৃষকরা অনেকাংশে উপকৃত হবে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী হাওরের পানি সরাতে ও প্রবেশ করাতেও পারবেন। এটি হাওর এলাকায় বোরো আবাদে কৃষকদের জন্য একটি মাইলফলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হবে। এতে আগাম বন্যার ঝুঁকিতে ফসল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আমিনুল হক বলেন, ‘হাওরে কজওয়ে নির্মাণ একটি মৎস্যবান্ধব প্রকল্প। কজওয়ের মাধ্যমে হাওর ও নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে। ফলে মাছের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত হবে। তবে হাওরের ফসল কেটে ঘরে তোলার পরপরই কজওয়েগুলো খুলে দিতে হবে। তা না হলে মাছের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফম) প্রফেসর ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাওরে কজওয়ে নির্মাণ হলে পানি প্রবাহের ভারসাম্য চলে আসবে। ফসলরক্ষা বাঁধের কারণে মাছের প্রজনন বাঁধাগ্রস্ত হয়। কজওয়ে হলে সে সমস্যা আর থাকবে না এবং আগাম বন্যার কবল থেকে হাওর অঞ্চল অনেকটাই রক্ষা পাবে।’