সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর দরগাহে বুধবার তারাবির নামাজ শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমের স্লোগানকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, সারজিস আলম একের পর এক স্লোগান দিচ্ছেন। তার স্লোগানে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন হাজারো মানুষ। এর মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী শাহজালাল (র.) দরগাহের পবিত্রতা বিনষ্ট হয়েছে দাবি করে অনেকে ফেসবুকে ক্ষোভ নিন্দা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে এনসিপি সিলেট জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন শাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারাবির নামাজ শেষে দরগাহ চত্বরে প্রচুর সংখ্যক জেন-জি (জেনারেশন জেড) জড়ো হয়েছিলেন। তারা মূলত হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে নানামুখী স্লোগান দিচ্ছিলেন। পরে সারজিস আলমও তাদের সঙ্গে স্লোগান দেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিলেট সফরকালে দরগাহ জিয়ারতের সময় অনেকে দরগাহ শরিফের ভেতরে ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ বলে স্লোগান দেয়। এটা আবেগের বিষয়। পবিত্রতা ও ভাবগাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনতে দরগাহ শরিফ এলাকায় মদ-গাঁজা বন্ধের দাবি তার।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এনসিপির সিলেট জেলা ও মহানগরের আয়োজনে বুধবার বিভাগীয় ইফতার মাহফিল ছিল। এ মাহফিলে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম যোগ দেন। পরে তারা হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করেন।
নামাজ শেষে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা বেরোনোর সময় দরগাহে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষ মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে থাকেন। এ অবস্থাতেই দরগাহ থেকে নাহিদ ইসলাম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বের হয়ে যান। তবে সারজিস আলম একপর্যায়ে দরগাহের ভেতরে অবস্থিত নারীদের ইবাদতখানার ছাদে দাঁড়িয়ে স্লোগান ধরেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত হাজারো মানুষ কণ্ঠ মেলান।
সারজিস আলম ও অন্যরা এ সময় ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘গোলামি না আজাদি, আজাদি আজাদি’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেবো রক্ত’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘যুগে যুগে লড়ে যাবো, আমরা সবাই হাদি হবো’, ‘তুমি কে আমি কে, হাদি হাদি’—এমন নানা স্লোগান দেন।
এ বিষয়ে সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী (কিম) সারজিস আলমের ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘সুলতানুল বাঙাল হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের সময় আজ পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল দলীয় স্লোগান দিয়ে মাজার এলাকার আদব নষ্ট করেনি। (গতকাল) মধ্যরাতে মাজার জিয়ারতের নামে এনসিপির নেতৃবৃন্দ যে আচরণ করলেন, তা সুফি দরগাহের আদবের খেলাফ। মহিলা ইবাদতখানার উপরে ওঠে সারজিস আলম স্লোগান দিলেন দিল্লি না ঢাকা! তাদের এই আচরণে আমি ক্ষুব্ধ।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে শেয়ার করা আরেকটি ভিডিও বার্তায় আব্দুল করিম লেখেন, ‘এ ঘটনায় আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মানুষ ক্ষুব্ধ। দরগাহ শরিফের একটি নিয়ম বা উসুল আছে। এ ক্ষেত্রে সেই পবিত্রতার কিংবা নীরবতা পালন করা হয়নি।’
মাহতাব শাহ ফকির নামের একজন লিখেছেন, ‘কোনটা দোয়ার জায়গা আর কোনটা স্লোগানের মঞ্চ, যারা এই পার্থক্যই বুঝতে পারে না, তারা কীভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে? সিলেট আধ্যাত্মিকতার রাজধানী। এ নগর ওলিদের স্মৃতি বহন করে। এখানে আবেগ নয়, আদবই প্রথম শর্ত। পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। আধ্যাত্মিক পরিবেশে অপ্রাসঙ্গিক কর্মকাণ্ড কখনোই মানানসই নয়। এসব কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানাই।’
মঈনুল হোসেন মনোয়ার নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ-বিএনপি এরা বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশ শাসন করেছে। ৩৬০ আউলিয়ার শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রা.)-এর পবিত্র দরগাহ প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে কখনও এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেয়নি। মসজিদ, ওলি, আউলিয়াদের দরগাহ শরিফ রাজনীতি চর্চার স্থান নয়। এ কেমন মূর্খতা...? ঘৃণাভরে এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
এর আগে ইফতার মাহফিলে সারজিস আলম বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে কিছু আসনে ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তবু জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে আমরা সেই নির্বাচন মেনে নিয়েছি। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের কোনও নির্বাচনে কেউ যদি ভোটে প্রভাব বিস্তার বা কারচুপির চেষ্টা করে, আমরা সেই কালো হাতকে ভেঙে দেবো। জনগণের ভোটের অধিকার জনগণকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, জনগণ তা মেনে নেবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে অফিসের দলীয় লোক মানুষকে তটস্থ করে রাখতো। আমরা আর সেই বাংলাদেশ দেখতে চাই না। যারা ফ্যাসিবাদের প্রমাণিত দোসর বা জুলাই বিপ্লবের বিরোধী ছিল, তাদের যদি আপনারা প্রশ্রয় দেন, তবে সেই ফাঁদে আপনাদেরই শেষ হতে হবে।’