শাহজালালের মাজারে চার দিনে ১৭ লাখ টাকা, সঙ্গে স্বর্ণালঙ্কার ও ডলার-পাউন্ড

সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা তিনটি ডেগ ও দানবাক্সের টাকা গণনা শেষ হয়েছে। গণনা শেষে দেখা গেছে, সিলগালা করা তিনটি ডেগ ও দানবাক্স স্থাপনের চার দিনে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়েছে। আরও পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও ডলার-পাউন্ড এবং চিঠি।

এর আগে ৭০৭ বছরের রীতি ভেঙে সোমবার (২২ জুন) দুপুর ২টার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সিলগালা করা দানের বড় তিনটি ডেগের মুখ খোলা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গণনা শেষ হয়।

টাকা গণনায় অংশ নেন শাহজালাল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। এর আগে মাজারের ইতিহাসে এভাবে প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনা করা হয়নি।

এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াকফ পরিদর্শক মো. সজল মিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চার ঘণ্টাব্যাপী গণনা শেষে আমরা ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পেয়েছি। পাশাপাশি দানবাক্সে টাকার সঙ্গে সাত আনা স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াল, ডলার, পাউন্ড এবং স্বর্ণের চেইন, আংটিসহ ছোট ছোট স্বর্ণের টুকরো। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি চিঠিও পেয়েছি।’

জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সিলগালা করা দানের বড় তিনটি ডেগের মুখ খুলে টাকা গণনা শুরু হয়

মাজারের প্রায় ৭০৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোমবার দুপুর ২টায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে খোলা হয় মাজারের দানবাক্সগুলো। জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালা করে দরগাহ মসজিদের সামনে গণনার জন্য নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় টাকা গণনা। গণনার কাজে আধুনিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গণনা মেশিন ব্যবহার করা হয়। মোট ৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা গণনার কাজে সহযোগিতা করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাপ্ত এই অর্থ পরবর্তীতে কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানান, সোমবার শাহজালালের মাজারে জোহরের নামাজ আদায় করেন জেলা প্রশাসক। নামাজ শেষে বেলা ২টার দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত ডেগ ও জেলা প্রশাসনের স্থাপনকৃত দানবাক্সের তালা খোলা হয়। পরে ডেগ ও দানবাক্স থেকে টাকা বের করা হয়। পরে সেগুলো গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়। দানের টাকা গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়েছে। 

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারের দীর্ঘদিনের চেনা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তার এই পদক্ষেপের পর দেশজুড়ে যেমন প্রশংসা ও নানামুখী আলোচনার ঝড় ওঠে, তেমনি তৈরি হয় বিতর্কও। এরই মধ্যে রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। মাজারের দানবাক্সে হাত দেওয়ার পরপরই ডিসির এমন আকস্মিক বদলি হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।

পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও ডলার-পাউন্ড এবং চিঠি

এদিকে, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনার এই নজিরবিহীন উদ্যোগের পেছনে থাকা জেলা প্রশাসককে আকস্মিক প্রত্যাহারের ঘটনায় সোমবার দিনভর সিলেটজুড়ে মিছিল ও সমাবেশে করেছে বিভিন্ন সংগঠন। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই চলেই এই মানববন্ধন ও সমাবেশ। এর আগে রবিবার বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে ডিসিকে পুনরায় বহালের দাবি জানানো হয়। না হলে হরতালসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যও নিয়োজিত করা হয়।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার (১২ জুন) সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়। নতুন দানবাক্স বসানোর পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মাজারের দান সংগ্রহ প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ভক্তদের দেওয়া সব দান প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়নে থাকা এই দানবাক্সগুলোতে জমা হবে। আগে যেমনটা হাতে হাতে দানের টাকা নেওয়া হতো, এখন আর এমনটা করা যাবে না। প্রশাসনের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।