নেত্রকোনায় বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে দিন-রাত মিলিয়ে ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে এই ভয়াবহ সংকটের কারণে স্থানীয় গ্রাহকদের মাঝে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ও হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘লোডশেডিং কমিয়ে আনতে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়াতে পুলিশকে জানানো হয়েছে।’
এর আগে সোমবার নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, নেত্রকোনা ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র থেকে নয়টি ৩৩ কেভি ফিডারের মাধ্যমে নেত্রকোনার ১০টি উপজেলা এবং সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৭ মেগাওয়াট। তবে তিন দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় ব্যাপক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট রাত ১টায় ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। ৮ আগস্ট বিকাল ৫টায় ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৬৩ মেগাওয়াট। আর ৯ আগস্ট রাত ১১টায় ১২৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬০ মেগাওয়াট।
চিঠিতে বলা হয়, ১১ কেভি ফিডার দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বিদ্যুৎ চালু হলে ফ্রিজ, পানির পাম্প, আইপিএসসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম একসঙ্গে চালু হয়। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা প্রায় দেড় গুণ বেড়ে যায়। ফলে গ্রাহকপর্যায়ে লোডশেডিং ৭২ থেকে ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন না করার কথা উল্লেখ করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এর মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমীতে অবস্থিত বিআর পাওয়ারজেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এবং আরপিসিএল ময়মনসিংহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, অতিমাত্রায় লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। মোবাইল ফোনে কর্মকর্তাদের গালিগালাজের পাশাপাশি অফিস ঘেরাও ও ভাঙচুরের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বকেয়া আদায়ে অভিযান পরিচালনার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অতর্কিত হামলা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দাবি, গাজীপুরের বরমীর ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখা হলে নেত্রকোনা গ্রিড উপকেন্দ্রে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া সম্ভব হবে। এতে লোডশেডিংও সহনীয় পর্যায়ে রাখা যাবে। এ অবস্থায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন সব অফিস ও ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া বলেন, ‘রাইতে-দিনে মিলায়া ৪ থেইক্যা ৫ ঘণ্টা কারেন থাহে। আয়ে আর যায়। গরমে রাইতে ঘুমাইতাম পারি না। ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করতে পারতাছে না।’
আটপাড়া উপজেলার মোগলহাট্রা গ্রামের আব্দুল গনি বলেন, ‘কারেন্ট থাহে কিনা এইডা অহন কথাই না। অহন হইছে, কারেন্ট কি আইব। ২৪ ঘণ্টায় ৩ কি ৪ ঘণ্টা পাই। ১৮-২০ ঘণ্টা থাহে না। এইডাও ১০ থেকে ২০ মিনিট কইরা একবারে পাই। বাচ্চাদের গরমে অসুখ অইতাছে। ফ্রিজ, ফ্যান চলে না। ভোল্টেজও কম থাহে।”
বিষয়টি স্বীকার করেছেন নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সরবরাহ কম পাওয়ায় আমরা গ্রাহকদের দিতে পারছি না।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘গতকাল বিভাগীয় কমিশনার স্যার নেত্রকোনায় এসেছিলেন। তাকে বিদ্যুতের বিষয়টি অবগত করেছি। জেলার বিদ্যুৎ অফিসগুলোসহ উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা বিধানে পুলিশকে বলেছি। আশা করছি, দ্রুত লোডশেডিং কমে আসবে।’









