হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্সে সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের প্রশংসা করে একটি বেনামি চিঠি পাওয়া গেছে। সোমবার (২২ জুন) বিকালে মাজারের তিনটি দানবাক্সের টাকা গণনার সময় চিঠিটি পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (সাধারণ শাখা) তানভীর হোসাইন সজীব।
তিনি বলেন, ‘দানবাক্সের টাকা গণনাকালে কয়েকটি চিঠি ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি চিঠিতে প্রত্যাহারকৃত জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাজারের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং সেখানে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাজারের জায়গা দখল করে দোকানপাট ও বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ করা হয়।’
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘ডিসি সাহেব, আসসালামু আলাইকুম। শাহজালাল মাজারের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপনার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেটসহ সারা দেশে এমনকি বিদেশে অবস্থানরত লোকজন আপনার শুধু প্রশংসাই করছেন না, শতকরা ৯৫% মানুষ আপনার পক্ষেই আছেন। সবচেয়ে বড় লুটপাটকারী হচ্ছে দরগাহের কেরানি শামুন মাহমুদ খান। অর্ধেক টাকাই সে মেরে দেয়। সে কেরানি হয়েও বড়াই করে বলে সে নাকি খাদিম। এ সবই মিথ্যা। পড়াশোনা করেছে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত। এখন লম্বা লম্বা কথা বলে। দরগার জায়গায় বাড়ি করেছে, দোকানপাট করেছে। এ সমস্ত জায়গা উদ্ধার করা একান্ত প্রয়োজন। দয়া করে দেখবেন, তাকে নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। সেই মূলহোতা।’ একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।
এরই মধ্যে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা তিনটি ডেগ ও দানবাক্সের টাকা গণনা শেষ হয়েছে। গণনা শেষে দেখা গেছে, সিলগালা করা তিনটি ডেগ ও দানবাক্স স্থাপনের চার দিনে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়েছে। আরও পাওয়া গেছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও ডলার-পাউন্ড এবং চিঠি।
এর আগে ৭০৭ বছরের রীতি ভেঙে দুপুর ২টার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সিলগালা করা দানের বড় তিনটি ডেগের মুখ খোলা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গণনা শেষ হয়।
টাকা গণনায় অংশ নেন শাহজালাল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। এর আগে মাজারের ইতিহাসে এভাবে প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনা করা হয়নি।
সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াকফ পরিদর্শক মো. সজল মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চার ঘণ্টাব্যাপী গণনা শেষে আমরা ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পেয়েছি। পাশাপাশি দানবাক্সে টাকার সঙ্গে সাত আনা স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াল, ডলার, পাউন্ড এবং স্বর্ণের চেইন, আংটিসহ ছোট ছোট স্বর্ণের টুকরো। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি চিঠিও পেয়েছি।’
মাজারের প্রায় ৭০৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সোমবার দুপুর ২টায় জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে প্রকাশ্যে খোলা হয় মাজারের দানবাক্সগুলো। জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালা করে দরগাহ মসজিদের সামনে গণনার জন্য নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় টাকা গণনা। গণনার কাজে আধুনিকতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গণনা মেশিন ব্যবহার করা হয়। মোট ৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা গণনার কাজে সহযোগিতা করেন। পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করেন জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাপ্ত এই অর্থ পরবর্তীতে কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানান, সোমবার শাহজালালের মাজারে জোহরের নামাজ আদায় করেন জেলা প্রশাসক। নামাজ শেষে বেলা ২টার দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত ডেগ ও জেলা প্রশাসনের স্থাপনকৃত দানবাক্সের তালা খোলা হয়। পরে ডেগ ও দানবাক্স থেকে টাকা বের করা হয়। পরে সেগুলো গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়। দানের টাকা গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও মাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারের দীর্ঘদিনের চেনা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তার এই পদক্ষেপের পর দেশজুড়ে যেমন প্রশংসা ও নানামুখী আলোচনার ঝড় ওঠে, তেমনি তৈরি হয় বিতর্কও। এরই মধ্যে রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়। মাজারের দানবাক্সে হাত দেওয়ার পরপরই ডিসির এমন আকস্মিক বদলি হয়েছে বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।