আসাম প্রদেশের প্রথম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠান আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। একসময় যে কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে, শতবর্ষ পেরিয়ে সেই প্রতিষ্ঠান এখন প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যাপীঠ। কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, বিতর্ক, বিজ্ঞান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় শিক্ষার্থীরা।
যেভাবে শুরু
মুরারিচাঁদ হাইস্কুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৮৬ সালে। সিলেটের রায়নগরের জমিদার মুরারিচাঁদ রায়ের কন্যা ব্রজসুন্দরী দেবীর দত্তকপুত্র রাজা গিরিশচন্দ্র রায় এটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯২ সালের ২৭ জুন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাইস্কুলটি কলেজে রূপান্তর করা হয়। চার জন শিক্ষক ও ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এফএ বা ফার্স্ট কোর্স চালুর মধ্য দিয়ে কলেজটির যাত্রা শুরু। ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল এটি সরকারি কলেজের মর্যাদা পায়। তখন শিক্ষার্থী ছিলেন ৯৮ জন এবং শিক্ষক ছয় জন।
পরবর্তী সময়ে আসাম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ ওরফে কাপ্তান মিয়ার উদ্যোগে কলেজটির বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯২১ সালের ১৯ আগস্ট সিলেট শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে থ্যাকারে টিলায় কলেজটির বর্তমান অবস্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন আসামের গভর্নর স্যার উইলিয়াম মরিস। পরে আসাম প্রদেশের আরেক গভর্নর স্যার উইলিয়াম রিডের সময়ে ১৯২৫ সালের ২৭ জুলাই কলেজের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর নির্মাণকাজের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন হয়।
আজও সেই সময়ের আসাম প্যাটার্নের স্থাপত্যের অনেক ভবন কলেজের ইতিহাস বহন করছে। শত বছরের পুরোনো এসব ভবনে এখনও শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে। কলাভবনের সামনের পুরোনো টিনশেডের অ্যানেক্স ভবন, কাঠের সিঁড়ি এবং শতবর্ষী কয়েকটি বৈদ্যুতিক পাখা এখনও অতীতের সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পদচারণা
এমসি কলেজের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ১৯১৯ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই কলেজ প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও এ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসে। পরে ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। ১৯৯২ সাল থেকে স্নাতক এবং ১৯৯৫ সাল থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের কোর্স জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
১৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যাপীঠ
বর্তমানে এমসি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শুধু বিজ্ঞান শাখা চালু রয়েছে। এ ছাড়া মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে স্নাতক (পাস), ১৫টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৬টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে।
কলেজের নয়টি অ্যাকাডেমিক ভবনে প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। অনুমোদিত ১৩৯টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১১ জন। ফলে শিক্ষক সংকটও রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও ইতিহাস বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে মাত্র একজন করে শিক্ষক দিয়ে চলছে। তবে পরিসংখ্যান বিভাগে আপাতত গণিত বিভাগের দুই শিক্ষকও ক্লাস নিচ্ছেন। কলেজের ভেতরে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলও রয়েছে, যেখানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
এমসি কলেজে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বর্তমানে সেখানে ২৮ হাজার ১১৬টি বই রয়েছে। রয়েছে অডিটোরিয়াম, ছাত্র সংসদ ভবন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জুলজিক্যাল মিউজিয়াম, মসজিদ, পোস্ট অফিস, ছয়টি ব্লক নিয়ে গঠিত আসাম প্যাটার্নের একটি ছাত্রাবাস, পাঁচতলা আরেকটি ছাত্রাবাস এবং দুটি ছাত্রীনিবাস।
শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য রয়েছে তিনটি বাস। আছে বিশাল খেলার মাঠ। পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক ১৪টি সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সাংস্কৃতিক চর্চায় রয়েছে মোহনা সাংস্কৃতিক সংগঠন, মুরারিচাঁদ কবিতা পরিষদ ও থিয়েটার মুরারিচাঁদ। সাংবাদিকতার জন্য রয়েছে এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি। এ ছাড়া ডিবেটিং সোসাইটি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও বিজ্ঞান ক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠন শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করছে।
শতবর্ষের ম্যাগাজিন
এমসি কলেজের প্রকাশনা ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘দ্য মুরারিচাঁদ কলেজ ম্যাগাজিন’ নামে কলেজ বার্ষিকীর প্রথম প্রকাশনা বের হয়। দেশভাগের পর এর নাম হয় ‘মুরারিচাঁদ কলেজ বার্ষিকী’। স্বাধীনতার পর প্রকাশনাটির নামকরণ করা হয় ‘পূর্বাশা’। বর্তমানে এ নামেই এটি প্রকাশিত হচ্ছে।
বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম নয়
এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী লবীব আহমদ বলেন, ‘এমসি কলেজ কোনও অংশেই একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম নয়। ১২৪ একরের এই সবুজ ভূমি প্রকৃতি দ্বারা আচ্ছাদিত। ক্যাম্পাস কিংবা ছাত্রাবাসে প্রবেশ করলেই আলাদা এক শান্তি অনুভূত হয়।’
তিনি বলেন, ‘কলেজের শিক্ষকরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ক্লাস নিয়ে থাকেন। কলেজে রয়েছে অনেক স্মার্ট ক্লাসরুম। এখানে শুধু পড়ালেখাই নয়, মুক্ত সংস্কৃতি চর্চাও হয়। এ ক্যাম্পাস থেকে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে অনেকেই মেডিকেল, বুয়েট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পায়। আর অনার্সে পড়ে বিসিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ চাকরিতে, এমনকি জাতীয় টেলিভিশনের হেড অফিসেও অনেকে চাকরি করছেন।’
লবীব আহমদ বলেন, ‘আশা করি প্রিয় এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান শতক শতক ধরে কলেজের সুনাম বজায় রেখে এগিয়ে যাবে।’
সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, ‘দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুরারিচাঁদ কলেজ। এটি অবিভক্ত ভারতের সিলেট, ময়মনসিংহ, আসামসহ এই বিশাল অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছে। মুরারিচাঁদ কলেজ তো ১৩৪ বছরে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি করেছে, যারা দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং করে যাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘এটা বাংলাদেশের শতবর্ষী যেসব কলেজ আছে, তার মধ্যে অন্যতম একটা সেরা কলেজ। এরকম দৃষ্টিনন্দন ক্যাম্পাস আর দেশের কোথাও নেই। এখানে আসাম স্থাপত্যে নির্মিত এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যে নির্মিত অনেক ভবন আছে, যে ভবনগুলো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।’
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংস্কার প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আসাম প্যাটার্নের যে টিনশেডটি আছে, সেটার সংস্কারের কাজ শিগগিরই শুরু হবে আশা করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারপর আমরা লাইব্রেরি, বিভিন্ন ল্যাবকে আধুনিকীকরণের চেষ্টা করছি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজও করছি। পরিসংখ্যান ও ইতিহাসের শিক্ষক সংকটের কথা ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরে জানিয়েছি। আর পরিসংখ্যানে আপাতত গণিতের দুজন শিক্ষক ক্লাসও নিচ্ছেন।’
শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন—এই সংগঠনগুলোকে আমরা পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকি। এসব সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের মননশীলতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ক্রীড়া আয়োজন করা হয়।’
শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়নের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আরও চেষ্টা করছি আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলোকে কীভাবে আরও যুগোপযোগী করা যায়। আমাদের বেশ কিছু কক্ষ স্মার্ট ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। অন্যান্য কক্ষেও যেন তা করা যায়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
অধ্যক্ষ বলেন, ‘ভবিষ্যতে আরও দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মুরারিচাঁদ সরকারি কলেজ।’
শতবর্ষের পুরোনো স্থাপত্য, দীর্ঘ শিক্ষা-সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর সময়ের সঙ্গে আধুনিকায়নের প্রয়াস—সব মিলিয়ে সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এই অঞ্চলের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।