গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ সরকার: জামায়াত আমির

বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‌‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। গত সাত মাসে সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তবে সরকার প্রায়ই দাবি করছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো।’ 

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকালে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। দুই দিনের সফরে আজ সকালে সিলেটে আসেন শফিকুর রহমান। কয়েকটি দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মতবিনিময় সভা করবেন তিনি। 

মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারি দল, যখন যে সরকারে থাকে, আইসাই বলে যে আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো। আমি সংসদে কথাটা বলেছি, ওই আগটাকে বুঝলাম না, আর ভালোটাও দেখলাম না। আপনি ভালো বলবেন। পথেঘাটে, রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ঘরে-দুয়ারে যা ঘটতেছে, ভালো বলবেন?’

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটা ছেলে কিছুদিন আগে মারা গেলো। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাহিদা ম্যাডামের ছেলে; এখন তাকে দুষ্টু বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা দায়িত্ব এভয়েড করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে দুষ্ট হলে এভাবে মারবে তারে? সে যদি দুষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ভালো করার চেষ্টা করেছি আমরা? এখন তার দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে ফেলে দেওয়া, এটা কোনও ভালো লক্ষণ নয়।’

মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সবার ব্যাপারে খবর রাখেন, শুধু নিজেরটা পারেন না। তার একই রাজনৈতিক দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, “মাদকের বড় চালান আসে উনার এলাকা থেকে। আমরা বলিনি।”’

চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, ‘সিলেটে চাঁদাবাজি নেই—এমনটা বলা যাবে না। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারলে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসবে। সাংবাদিকেরা অনেক সময় চাপের মধ্যে কাজ করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও চাপ থাকে।’

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে চীন, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়াই এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। একা বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। আমি নিজেও একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছি এবং সেখানে তাদের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছি। রোহিঙ্গাদের জন্য সাময়িক অর্থসহায়তা দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। তাদের নিজ দেশে ফেরার মতো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘জ্বালানি নিয়ে জামায়াতের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ নিতে রাজি হয়নি সরকার। বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের দেওয়া পরিকল্পনাও সরকার গ্রহণ করেনি।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘গত সাত মাস বা সাড়ে সাত মাসের মধ্যে দেশকে আমরা কোন পথে দেখছি? আপনারা যে পথে দেখছেন, আমিও সে পথে দেখছি। দেখেন, সংকট তো প্রথম দিন থেকেই তৈরি হয়ে গেছে। আর এটা সরকার নিজেই তৈরি করলো। তারা জনমতের রায়কে মানলো না। মানলে একই দিনে দুইটা শপথ হবে এবং একই সময়ে দুইটা ভিন্ন ভিন্ন অধিবেশন আহ্বান হবে। আগে তারা বললেন যে আমরা মানবো। কোনও প্রকারেই কিন্তু তারা না বলেন নাই। আমাদের আগে তারা বলছেন। এখন তারা বলতেছেন আমরা মানবো না। সংকট ওখান থেকে তৈরি হয়েছে।’

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এরপরে যখন আমাদের চাপ, বৈশ্বিক চাপ, সবকিছু যখন আসছে- আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন বলছে আর এক টাকাও আমরা দেবো না, এটা যদি আপনারা পরিবর্তন না করেন, তখন বাধ্য হয়ে আবার বিলে এটা ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। তো আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এ দেশের মানুষের চাপে এটা হতো না, যদি দুনিয়ার ওই সমস্ত জায়গা থেকে চাপ না আসতো। তো দুনিয়ার চাপে আপনি নতি স্বীকার করলেন, মেনে নিলেন। দেশের বাস্তবতাটা মেনে নিলে আরও সম্মানিত হতেন।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন- আমরা তো আগেই চেয়েছিলাম যে জাতীয় নির্বাচনের আগে। এখন তো দুই বছরের অধিক সময় চলে গেলো। অনেক জায়গাতেই তো নির্বাচিত প্রতিনিধি নাই, পালিয়ে গেছে। মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। কিন্তু এখনও গড়িমসি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী এবং স্বাধীন। তো স্বাধীন নির্বাচন কমিশন একটা শিডিউল ঘোষণা করলো, এটা বন্ধ করা হলো কেন? এটা কি প্রমাণ করে যে ওই নির্বাচন কমিশন স্বাধীন এবং শক্তিশালী?’

মতবিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিসিকের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মেয়র প্রার্থী নূরুল ইসলাম বাবুল ও সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর প্রমুখ।