বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলী খান দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে সিলেট থেকে পাঠিয়েছিলেন বিশেষ উপঢৌকন-ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি। সিলেটের এই শীতল পাটির বিশেষ কদর ছিল মুঘল দরবারে। শুধু শীতলপাটি নয়, সিলেটের মুগা-তসর কাপড়েরও ছিল ব্যাপক চাহিদা। ইতিহাসের নানা বাঁকে তাই শীতলপাটি হয়ে উঠেছে সিলেটের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের এক অনন্য পরিচয়।
শীতলপাটি হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। আদিকাল থেকে চলে আসা গ্রামীণ জনপদের একটি কারুশিল্প। আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় এ শিল্পটি বিভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন, ‘আসুক, আসুক বেটির দামান/ কিছুর চিন্তা নাইরে/ আমার দরজায় বিছায়া থুইছি/কামরাঙ্গা পাটি নারে’।
কবি জসিমউদদীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কবিতায় উল্লেখিত কামরাঙ্গা পাটিই হচ্ছে এ দেশের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি। কবি মোহিত ঘোষ লিখেছেন, ‘শীতলপাটি, শীতলপাটি/পিতল-পানা রঙ/ অতল জলে চিতল মাছ/ করছে কত ঢঙ।’
ফারুক নওয়াজের লেখা শিশুতোষ ছড়ায় উঠে এসেছে, ‘শাড়ি চাই না জুতা চাই না, কাঁথা বুনবার সুতা চাই না/চাইনারে তোর পয়সা-কড়ি, তসবি শীতলপাটি/ খোকারে তোর ভাবনা তাইরে, ঘুম হইছে মাটি/ সামনে আছে ঈদের ছুটি, করবিনে তুই হেলা/ সন্ধ্যে বেলায় আইয়া পড়বি, উঠলে বিয়ান বেলা।’
বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান শীতলপাটি সম্পর্কে বলেছেন, আমাদের সংস্কৃতিতে বাঙালিরা যত অবদান রেখেছে শীতলপাটি সেসবের মধ্যে সময়োত্তীর্ণ একটি নিদর্শন।
জানা গেছে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল দৌলতপুরে বিকাল বেলায় গাছের ছায়ায় শীতলপাটি বিছিয়ে কবিতা-গান রচনা করতেন। নার্গিস নানা কাজের ছলে সেখানে ছুটে আসতেন। কবি ও কবির প্রিয়া তখন চোখের ভাষায় ভাব বিনিময় করতেন।
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট এসেছিলেন। সিলেট সফরকালে সিলেটের বেত ও বাঁশের বানানো চেয়ার টেবিল ও ব্যাগ ইত্যাদি দেখে অভিভূত হয়ে কয়েক ফর্দ কিনে নিয়ে শান্তিনিকেতনে ব্যবহার করেছেন। বাঁশ বেত সামগ্রীর মধ্যে শীতলপাটিই সবচেয়ে বিখ্যাত। একসময় মুগল বাদশাহদের মন জুগিয়েছিল এটি। আজও বাংলাদেশে আসা রাজা, রাণী, রাষ্ট্রনায়ক, মেহমান গুণীজনকে অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা জানানো বা উপহার সামগ্রী হিসেবে শীতলপাটির বিকল্প নেই। এই ধারাবাহিকতা আজও আছে।
প্রাচীনকালে এ দেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। তাই গরমের দিনে কাঁথা বা তোষকের ওপর শোয়ার জন্য শীতলপাটি ব্যবহৃত হতো। চিকন চিকন বেতিতে বোনা সে পাটিতে পিঠ এলিয়ে দিলেই শরীর মন শীতল হয়ে যেত। এজন্য এ পাটির নাম কালক্রমে হয়ে যায় শীতলপাটি। মুর্তা বা পাটিপাতা গাছের বেতি তুলে এ পাটি নকশি করে বোনা হয় বলে অনেকে একে নকশিপাটিও বলে থাকেন। এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ গাছ বিভিন্ন নামে পরিচিত। সিলেটে মুর্তা, মুন্সীগঞ্জে মোত্রাবেত, নোয়াখালীতে মেস্তাগ, ঝালকাঠিতে পাইত্তা, কুমিল্লায় মোতাবাইকসহ মুর্তাবেত, মোতাবেত, পাটিবেত ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Schumannianthus dichotoma এটি Marantaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এ গাছগুলো ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত উচ্চতা বিশিষ্ট হতে পারে এবং ব্যাসার্ধে ২-৩ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
জুন-জুলাই মাসে গাছে ফুল আসে, সেপ্টেম্বরের দিকে গাছ পাকে বা কাণ্ড শক্ত হয়। তখন কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পরে তা থেকে বেতি তুলে পাটি বোনা হয়ে থাকে। ফুল, মসজিদ, লতাপাতা, প্রাণী ও পাখিদের ছবি দিয়েও এসব পাটিকে অলংকৃত করা হয়। তবে মানানসই রঙে বিভিন্ন আল্পনা দিয়ে যেসব শীতলপাটি বোনা হয় সেগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। সেগুলোকে বলা হয় নকশিপাটি। শিল্পীরা এ বাহারি পাটির বিভিন্ন নামও দিয়ে থাকেন। যেমন, খেলাঘর, নয়নতারা, আসমান তারা, জমিন তারা, তাজমহল, সোনামুড়ি ইত্যাদি। শোয়ার পাটি ছাড়াও মুর্তাবেতি দিয়ে জায়নামাজ, দেয়ালমাদুর, বসার আসন ইত্যাদিও তৈরি করা হয়।
শীতলপাটিকে একসময় বলা হতো সিলেটের মসলিন। ব্রিটিশ আমলে রানি ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদে স্থান লাভ করেছিল বালাগঞ্জের গৌরীপুরের শিল্পীদের তৈরি শীতলপাটি। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকেরা এসে জাহাজ ভিড়াতো বালাগঞ্জে। বিভিন্ন পণ্য বিক্রি শেষে তারা নিয়ে যেতেন বাহারি শীতলপাটি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ায় শীতল পাটির কদর ছিল ঈর্ষণীয়। ভারতবর্ষে আসার প্রমাণস্বরূপ তারা ঢাকার মসলিনের পাশাপাশি সিলেটের শীতলপাটি নিয়ে যেতেন।
সিলেটের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপঢৌকন হিসেবে বর-কনেকে শীতলপাটি দেওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। এছাড়া সিলেটে দেশি-বিদেশি কোনও অতিথি এলে তাদের শীতলপাটি উপহার দেওয়া হতো। আজকাল ঘর, দোকান বা অফিস সজ্জার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে এটি। আর গ্রীষ্ম মৌসুমে শীতল পরশ পেতে শীতলপাটির জুড়ি নেই।
গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য শীতলপাটি শিল্পের সাথে সিলেটের অন্যান্য স্থানের লোকজনও বিচ্ছিন্নভাবে জড়িত ছিলেন। বিশ্বনাথ, নবীগঞ্জ, ছাতক, জগন্নাথপুর, বাহুবল, চুনারুঘাট, বিয়ানীবাজার এলাকার অনেক নারী-পুরুষরা নিয়োজিত ছিলেন এ কারুশিল্পের সাথে। কিন্তু এর মধ্যে বালাগঞ্জের শীতলপাটিই অনন্য। শীতলপাটির সুবাদে বালাগঞ্জের শিল্পীরা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সুনামও অর্জন করেছেন। ১৯০৬ সালে কলকাতায় কারুশিল্প প্রদর্শনীতে বালাগঞ্জের যদুরাম দাস শীতলপাটির জন্য স্বর্ণপদক লাভ করেন।
১৯৮২ সালে বালাগঞ্জের শিল্পীদের কারুশিল্প দেশের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পের সম্মান অর্জন করে। ১৯৯১ সালে বিশ্বের কারুশিল্পের এক বিশাল প্রদর্শনী বসে ইটালির রোম শহরে। এ প্রদর্শনীতে শীতলপাটি নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বালাগঞ্জের বিলবাড়ি গ্রামের মনীন্দ্রনাথ। দৃষ্টিনন্দন বুনন শিল্পের কারণে পুরস্কার লাভ করে তখন বালাগঞ্জের শীতলপাটি আবারও বিশ্ববাসীর কাছে প্রশংসা কুড়ায়।
সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, মহাজনপট্টি ও শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ মার্কেটের বেত ও কারুশিল্পের দোকানগুলোতে শীতলপাটি পাওয়া যায়। এসব দোকানগুলোতে ৫শ’ থেকে ১০ হাজার টাকা মূল্যের শীতলপাটি রয়েছে। দোকানিরা জানান, সিলেটে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে শীতলপাটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন উৎসবে শীতলপাটি বিক্রি হয়। তবে সরবরাহ কম থাকায় অনেক ক্রেতাকে চাহিদা অনুযায়ী শীতলপাটি দেওয়া সম্ভব হয় না।
শীতলপাটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অর্জন এসেছে ২০১৭ সালে। সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি বুননকে ইউনেস্কো ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেইজ অব হিউম্যানিটিরর প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি শুধু শীতলপাটির নয়, সিলেটের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি ও কারিগরদের দক্ষতারও বিশ্বস্বীকৃতি।
তাই শীতলপাটি এখন শুধু ঘরের ব্যবহার্য সামগ্রী নয়- এটি সিলেটের পরিচয়, আমাদের সংস্কৃতির স্মারক এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরকে বাঁচাতে হবে, কাঁচামাল সংরক্ষণ করতে হবে এবং শীতলপাটিকে পৌঁছে দিতে হবে নতুন প্রজন্ম ও বিশ্ববাজারের কাছে। তাহলেই ঐতিহ্যের এই শীতল ছোঁয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।
ইতিহাস
শীতলপাটি বুননের সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও সিলেট অঞ্চলের শিল্প সচেতন মানুষের আবিষ্কার এই শীতলপাটি এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। নিখুঁত হাতের তৈরি শীতলপাটি একসময় আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠলেও শীতলপাটির পূর্বেকার অবস্থা এখন আর নেই। আধুনিকতা এই শিল্পের টুঁটি চেপে ধরেছে। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও কাঁচামালের অভাবে এ শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে প্রায়। সামান্য মুর্তাবেতকে রীতিমত শিল্পে পরিণত করেছে যে নিপুণ কারিগররা তারা এখন নানা সংকটের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছে। নব্বই দশক পর্যন্ত শীতলপাটির কাঁচামাল মুর্তাবেত সহজলভ্য ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মূর্তা বাগান কমতে শুরু করেছে।
বর্তমানে বালাগঞ্জসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মুর্তা বাগান থাকলেও এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। মুর্তা গাছের অপ্রতুলতার কারণে অনেক শিল্পীই নিজেদের আদি পেশা ছেড়ে অন্য পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। আশির দশকে তৎকালীন সরকার মুর্তা গাছ উৎপাদনে সিলেটের কৃষকদের মধ্যে ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮৫ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজারে বেসরকারি উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে মুর্তার চাষ শুরু হলেও দু-তিন বছর পর তা মুখ থুবড়ে পড়ে।
এরপর মুর্তা চাষ নিয়ে কোনও উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি। হস্তশিল্প ও কুটিরশিল্পকে উৎসাহিত করতে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও শীতলপাটির সুনাম পুনরুদ্ধারে তাদের কোনও ভূমিকা নেই বললেই চলে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি- বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। শিল্পদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে শত বছরের ঐতিহ্য শীতলপাটির সুদিন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে অভিজ্ঞজনেরা মনে করছেন।