সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স ও তার পরিবারের চার সদস্য এবং তিন বন্ধুসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) মধ্যরাতে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
তারা হলেন—সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর শহরের তেঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা দেওয়ান শাহনেওয়াজ চৌধুরী প্রিন্স (২০), তার বাবা দেওয়ান শাহরুখ রাজা চৌধুরী (৪৬), মা শাম্মী আক্তার পলি (৪০), ভাই দেওয়ান শাহরিয়ার চৌধুরী পিয়াল (১৮) ও বোন সাবরিনা চৌধুরী রূপকথা (১৬)।
এ ছাড়া প্রিন্সের বন্ধু সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাদেশ্বর গ্রামের তাকবির রহমান তানহির (২০), ছাতক উপজেলার জালালপুর গ্রামের কাওসার আহমদ সোহাগ (২১) ও দিরাই উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের ইফাত আলম রাবিদকেও (২১) গ্রেফতার করা হয়েছে।
রবিবার (০১ নভেম্বর) দুপুরে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করা হয়। পরে আদালতের বিচারক সাতজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ ছাড়া প্রিন্সের বোন সাবরিনা চৌধুরী রূপকথা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে তাদের হয়ে কেউ জামিনের আবেদন করেননি।
পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে শহরের নতুনপাড়া এলাকা থেকে প্রিন্সকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাকে অসুস্থ অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সিলেট নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পুলিশের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালের ভেতরেই পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন প্রিন্স। এ সময় তার পরিবারের লোকজন, বন্ধু ও সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালান। আসামিরা সরকারি কাজে বাধা দিয়ে পুলিশ হেফাজত থেকে প্রিন্সকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পুলিশ সদস্যদের মারধর করেন।
এ ঘটনায় সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফরিদ হোসেন বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলার পর শনিবার রাতে ওই হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে প্রিন্সের পরিবারের পাঁচ সদস্য ও বন্ধুসহ আটজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আজ তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সুনামগঞ্জ আদালত পুলিশের পরিদর্শক অজয় চন্দ্র দেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় সাবরিনা চৌধুরী রূপকথা ছাড়া বাকি সাত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।’
তবে পুলিশের ওপর হামলা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা ও সাজানো বলে দাবি করেছেন প্রিন্সের বাবা দেওয়ান শাহরুখ রাজা চৌধুরী। আটকের পর তিনি বলেছেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে প্রিন্সকে থানায় নেয় পুলিশ। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর অসুস্থ অবস্থায় সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায় পুলিশ। খবর পেয়ে আমি আর আমার স্ত্রী হাসপাতালে ছুটে যাই। সেখানে সদর থানার এসআই সাজ্জাদ আহমদ ও এসআই ফরিদ আহমদকে দেখতে পাই। তাদের কাছে জানতে চাই, “আটকের প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে এমন কী ঘটলো যে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো।” তখন প্রিন্সের মা পুলিশকে বলেছিলেন, সুস্থ ছেলেকে আটক করে থানায় নিলেন, আর এখন অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে এলেন। তাকে অবশ্যই থানায় নিয়ে মারধর করা হয়েছে।” এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের বাগবিতণ্ডা হয়।’
তিনি বলেন, ‘তখন প্রিন্সকে আমাদের জিম্মায় দিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে যায় পুলিশ। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে প্রথমে সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করাই। এরই মধ্যে পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করলো, আমরা নাকি হামলা করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। পুরোপুরি মিথ্যা ও সাজানো অভিযোগে মামলা দিয়ে গতকাল রাতে আমাদের হাসপাতাল থেকে আটক করলো পুলিশ।’
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রতন শেখ বলেন, ‘প্রিন্সের বিরুদ্ধে নাশকতার দুটি মামলা আছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর অসুস্থতা বোধ করলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন প্রিন্স। এ সময় তার পরিবারের লোকজন ও সহযোগীরা মব সৃষ্টি করে পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ ঘটনায় করা মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।’