ঢাকা লিট ফেস্ট প্রসঙ্গে বুকারজয়ী গীতাঞ্জলি শ্রী

‘নতুন দিগন্তে নিজের জগৎ উন্মুক্ত করার অপেক্ষায় আছি’

এবারের ঢাকা লিট ফেস্টে সরাসরি উপস্থিত থাকছেন বুকারজয়ী লেখক গীতাঞ্জলি শ্রী। যিনি এ বছর (২০২২) ‘টম্ব অব স্যান্ড’ (হিন্দি ভাষায় ‘রেত সমাধি’) উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার। ঢাকায় সরাসরি পৌঁছানোর আগেই এই লেখক জানান দিলেন উৎসবটি ঘিরে তার উচ্ছ্বাসের কথা। ইমেইলের মাধ্যমে তিনি বাংলা ট্রিবিউন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বিশ্বজুড়ে নারী লেখকদের যোগ্যতা, বাধা আর সফলতা নিয়ে। বলেছেন ঢাকা লিট ফেস্ট-এর কাছে তার প্রত্যাশার কথাও। ভারতের উত্তর প্রদেশের এই লেখকের সঙ্গে কথোপকথনগুলো তুলে ধরা হলো-

বাংলা ট্রিবিউন: ঢাকা লিট ফেস্টের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আপনাকে আগাম স্বাগতম। নিশ্চয়ই ভালো আছেন।

গীতাঞ্জলি শ্রী: নিশ্চয়ই। স্বাগত জানানোর জন্য ধন্যবাদ।

বাংলা ট্রিবিউন: শুরুতেই ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ নিয়ে কিছু শুনতে চাই। এবারের (৫-৮ জানুয়ারি, ২০২৩) উৎসবে আপনি যোগ দিচ্ছেন। আয়োজনটি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন?

গীতাঞ্জলি শ্রী: উপমহাদেশের একটি অংশের অনেক লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা পরিচিত হওয়া খুব সহজ কিন্তু একই সঙ্গে অনেক কঠিন। ঢাকার এই আয়োজনে উপস্থিত হয়ে– নতুন দিগন্তে নিজের জগৎ উন্মুক্ত করার অপেক্ষায় আছি।

বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান সময়েও প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীদের দমিয়ে রাখার একটা চেষ্টা থাকে। সাহিত্য জগৎও এর বাইরে নয়। এখানেও পুরুষেরা বেশ প্রভাবশালী। এই পরিস্থিতি কবে পাল্টাবে বলে মনে করছেন? কিংবা লেখক হয়ে এই সংগ্রামে টিকে থাকতে কী করতে হবে বলে মনে করেন?

গীতাঞ্জলি শ্রী: আপনি যা বলছেন অবশ্যই তা বলার কারণ আছে। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে- প্রথমত, বিশ্বজুড়েই নারীদের জন্য পরিবেশ বেশ প্রতিকূলে। সাহিত্যিক জরিপগুলোর ফলাফলে তুলনামূলক নারীদের সাহিত্যকর্মে পুরুষ পাঠকের সংখ্যা কত কম, তা খেয়াল করলেই স্পষ্ট হওয়া যায়।  

দ্বিতীয়ত, বৈষম্যে ভরা পৃথিবীতে আমরা সবসময় যেভাবেই হোক নিজেদের অবস্থান পেতে দরকষাকষি করছি এবং এই অন্যায্য পৃথিবীতে এগিয়ে যাওয়ার পথ সৃষ্টি করছি। তাই, নারী লেখকদের সংখ্যা প্রচুর এবং কেউ মানুক বা না মানুক তারা স্বীকৃতিও পাচ্ছে। কারণ, তারা এতই ভালো যে পুরুষদের সেটা অগ্রাহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না! এমনকি সেরা সৃজনশীল মানুষদের অনেকেই নারী, এমনকি এই উপমহাদেশেও।

এই প্রতিকূল অবস্থানকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার জন্য নারীরা বেশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া, এই তির্যক স্বীকৃতির মধ্যেও অনেক নারী এবং পুরুষের কাছে শিল্প ও সাহিত্য হলো শিল্পী ও লেখকের, নারী বা পুরুষের বিষয় নয়।

এই সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে আমি আবারও একমত হচ্ছি যে বর্তমানে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে, পরিকল্পিত বৈষম্য বিদ্যমান।

বাংলা ট্রিবিউন: বুকার জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, ব্যক্তিজীবনে অনধিকার প্রবেশ আপনি পছন্দ করেন না। একইসাথে আশাও ব্যক্ত করেছিলেন যে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাবে। আদৌ বদলেছে কি! নিজের সেই একান্ত সময় ফিরে পেয়েছেন কি?

গীতাঞ্জলি শ্রী: এখনও পুরোপুরি পাইনি, তবে পাবো। কৃতিত্ব ঘিরে বিশ্ব এখন সেলিব্রেটি ও হাইপ নিয়ে বেশি ব্যস্ত। তবে কিছু দিন পর এক বিষয়ে ক্লান্ত হয়ে অন্য কিছুতে সরে যাচ্ছে মনোযোগ। প্রকৃত সাহিত্য জগতে টিকে থাকবে তারাই যারা একনিষ্ঠভাবে জড়িত। আমি সর্বদা এর কদর করি। আমার একান্ত সময় খুঁজে নেওয়ার বিষয়ে আমি দারুণ পারদর্শী।

বাংলা ট্রিবিউন: শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশের মুহূর্ত সম্পর্কে জানতে চাই।

গীতাঞ্জলি শ্রী: এটি ছিল একটি স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়। এটি ছিল মূলত একটি বাস্তবসম্মত কর্মজীবনে থাকা। ফলে আবেগের দিক থেকে শিক্ষকতা ছাড়া কঠিন কিছু ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাস্তবতার নিরিখে কীভাবে লেখা যায় এবং দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা। লেখায় নিমগ্ন হওয়াতেই আমি খুশি ছিলাম। এখনও আছি।

বাংলা ট্রিবিউন: এতদিন পর এসে কোনও একটি পর্যায়ে আপনি কি আপনার সেই ক্লাসরুমের অভাববোধ করেন?

গীতাঞ্জলি শ্রী: আরে নাহ, ইতিহাসের ক্লাসরুমের জন্য আমি কখনও তৈরি হইনি। যদিও কোনও অভিজ্ঞতাই আপনার অস্পৃশ্য থাকবে না। আমার মনে হয় সেখান থেকে আমিও কিছু বিষয় শিখেছি এবং তা আমার কাছে সম্পদের মতোই মূল্যবান। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও লেখালেখির মাধ্যমে এখন আমি ইতিহাস শিখিয়ে যাচ্ছি।

বাংলা ট্রিবিউন: ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ কীভাবে বৈশ্বিক সাহিত্যিকদের মধ্যকার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে করেন?

গীতাঞ্জলি শ্রী: বইকে ঘিরে লিট ফেস্ট আয়োজন অনেক বিশাল ব্যাপার। বই হলো ভালোবাসা ও মানবতার বিষয়। সাহিত্য মানুষকে একত্রিত করে, বিভক্ত নয়। আমাদের একত্রিত করা এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিকে কাছাকাছি নিয়ে আসাটা সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। এই উৎসব আমাদের আরও নিবিড় সংলাপ ও সংস্কৃতি বিস্তৃতির দিকে নিয়ে যাবে। এতে জীবন, মানুষ এবং বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের সংবেদনশীলতা ও শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে বলেই মনে করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনাকে দ্রুতই সরাসরি ঢাকায় দেখার অপেক্ষায় আছি আমরা।

গীতাঞ্জলি শ্রী: আমিও।