বুক রিভিউ

শেহান কারুনাতিলাকার যে উপন্যাসের নায়ক মৃত

শেহান কারুনাতিলাকার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেইদা’ ২০২২ সালে বুকার পুরস্কার অর্জন করে। ঢাকা লিট ফেস্টের দশম আসরে আসছেন বুকারজয়ী এ লেখক। আগামী ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসবে সাহিত্যের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

শেহান কারুনাতিলাকার উপন্যাস ‘দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেইদা’। ইংরেজিতে বইটির রিভিউ করেছেন র‌্যান্ডি বয়াগদা। ঢাকা লিট ফেস্টের দশম আসর উপলক্ষে রিভিউটির অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।


মৃতদেহ পরিপূর্ণ একটি লেকের ওপর, আরেকটি মৃতদেহ একটা সার্ফবোর্ডের মতো পড়ে থাকে। সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ প্রকাশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বস্তু একটি এলভিস প্রিসলির ক্যাসেট। ভয়াবহ মৃত্যুর একটি রুপালি আস্তরণ হচ্ছে: কলম্বোর ট্রাফিক থেকে চিরতরে মুক্তি। ২০২২ সালের বুকার পুরস্কার বিজয়ী শেহান করুনাতিলাকা’র নতুন উপন্যাসটি দুঃসাহসিকভাবে অ্যাংলোফোন পাঠকদের কাছে আধুনিক শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। অন্যথায় এটি মাইকেল ওনদাতজে, মিশেল ডি ক্রেটজার, রমেশ গুনেসেকেরা, এবং বর্তমানের অনুক অরুদপ্রাগাসামের কথাসাহিত্যের লিরিক গ্র্যাভিটাস ও কসমোপলিটন জমিনে অভ্যস্ত একটি উপন্যাস। অপরদিকে, ব‌ইটির শিরোনাম ‘দ্য সেভেন মুনস্ অব মালি আলমেইদা’, বুক-ক্লাব এক্সোটিকাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও এটি আসলে শ্রীলঙ্কার ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের বিভিন্ন বর্বরতার নিয়ে অপার্থিবভাবে অপ্রাসঙ্গিক।

করুনাতিলাকা’র প্রথম উপন্যাস ‘চায়নাম্যান: দ্য লিজেনড অব প্রদীপ ম্যাথিউ’ একটি বিনোদনমূলক সাহিত্য। হাস্যরসাত্মক এই জীর্ণ গল্পটি ছিল এক মদ্যপ ক্রীড়া সাংবাদিককে নিয়ে, যে অতীতে অনেক বিখ্যাত কিন্তু বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া একজন ক্রিকেটারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।

এদিকে তার দ্বিতীয় উপন্যাসজুড়ে যেই দিগন্ত বিস্তৃত প্রাণঘাতী বিবরণ দিয়েছেন, তা জীবনের সকল স্তরকে স্পর্শ করে। ‘বোমা সম্পর্কে যে একটি ভালো কথা আপনি বলতে পারেন, তা হলে– এটি রেসিস্ট, বা সেক্সিস্ট কিংবা ক্লাস নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়।’ তিনি জীবিতদের জন্য বাস্তব সময়ের পরিণতি নিয়েও লিখেছেন। হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের জন্য বাবা-মায়েদের ক্রন্দনরত অবস্থায় পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করা; অতি খারাপ লোক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত গোপন কক্ষে ছেলেমেয়েদের গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা; এক তৃষ্ণার্ত বন্দিকে একজন গোয়েন্দা এক কাপ জল দেয় এবং সতর্ক করে তার চেহারার দিকে না তাকাতে। এই দৃশ্যগুলো আমরা দেখতে পাই উপন্যাসের কথক এবং নাম চরিত্র ‘মালি আলমেইদা’র মাধ্যমে, যিনি নিজেকে ফটোগ্রাফার, জুয়ারু এবং স্লাট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার নিজস্ব বলার ভঙ্গিটা ভালোভাবে অর্জিত, এই ভঙ্গিতেই বেশ অগোছালো এবং গ্রাফিক প্রাচুর্যে ভরপুরভাবে তার জীবনের গল্প শুনতে পারি আমরা।

ঘটনাক্রমে, ইতোমধ্যে মৃত অবস্থায় তিনি বিবরণ দিতে থাকেন। অন্য কথায়, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যখন ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়িয়ে বরফের কথা মনে করতে থাকে এবং যেখানে উপন্যাস শুরু হয়, এই উপন্যাসের নায়ক কর্নেলের চেয়েও কয়েক ধাপ এগিয়ে মৃত অবস্থায় উপন্যাসটি শুরু করেন। এবং ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ এর মতোই করুনাতিলাকা গল্প বলার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে আলাদা হয়ে মানবতাকে এক অদ্ভুত, আঁকাবাঁকা ও করুণ অবস্থার ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেছেন। একজন সমকামী, নাস্তিক ফটোসাংবাদিক মালি, যে সেই দ্বন্দ্বের সময় সবরকম দিক দেখেছে, এবং রক্ষণশীল শ্রীলঙ্কান সমাজে পুরুষের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, তার কাছে মাত্র সাতটি রাত আছে এটা খুঁজে বের করার জন্য যে কে তাকে খুন করেছে এবং কেন; এই সাতটি রাতের পরে তার জন্য বিবেচিত হবে হয় স্বর্গ কিংবা নরক।

মালি এই সময়টায় আরও একটা কাজ করেন, তার বন্ধুবান্ধব ও প্রেমিকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা। যদিও সে এটা করতে পারে শুধু একটা মধ্যকার জনাকীর্ণ, হইচইপূর্ণ, এবং কিছুটা আমলাতান্ত্রিক সমান্তরাল ডাইমেনশনের(এবং শ্রীলঙ্কার মিরর ভার্সন) মধ্যে থেকে। এই ডাইমেনশনের পরিধি তাকে সেই জায়গাগুলোতে যাওয়ার সুযোগ দেয়, বেঁচে থাকতে সে যেসব জায়গায় বিচরণ করেছে। মালি দুইজন মানুষের ওপর ফোকাস করে: ডিডি, যে একজন সরকারি দালালের ছেলে এবং মালির গোপন প্রেমিক; আরেকজন হলো ডিডির কাজিন জাকি, যে একজন রেডিও বক্তা এবং মালির সমকামিতা ঢাকার জন্য তার নকল প্রেমিকা। ডিডি আর জাকিই মালি নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম তার খোঁজ করতে শুরু করে, শেষবারের মতো তারা মালিকে কলম্বোর একটি ক্যাসিনোতে দেখেছিল। পরে তারা মালির মৃত্যুকে মেনে নিয়ে তার সবচেয়ে দামি ফটো নেগেটিভ রাখা একটা বাক্স খোঁজার দিকে মনোযোগ দেয়।

একটা কম্বিনেশন, যেটা সুজান সনট্যাগ ভালোভাবে বুঝতে পারবে, তার মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে সেই ফটোগ্রাফগুলো, যেগুলো মালির শেষ জীবনের যুদ্ধকালীন সবচেয়ে বড় কৃতিত্বগুলোর এবং এক‌ই সঙ্গে দ্বীপের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর ভয়ংকর অপরাধের সাক্ষী। গল্পটার রোমাঞ্চ আরও বেড়ে যায়, যখন এই ভয়ানক গোষ্ঠীগুলোও সেই বাক্সটির খোঁজে লেগে পড়ে, হয়তো নিজের গোপন তথ্য বাঁচাতে কিংবা অপরেরটা ফাঁস করতে। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগার ও তাদের সমব্যথীরা, জনতা বিমুক্তি পেরামুনা পার্টির বিদ্রোহী কমিউনিস্টরা, ভারতীয় শান্তিরক্ষী এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজারি অস্ত্র ব্যবসায়ীরা, যাদের সবাই ১৯৮৯-এর গৃহযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল।

শত শত পাতাজুড়ে এক অসম্পূর্ণ আত্মার শ্লেষাত্মক বর্ণনা, যা তার সমান্তরাল ডাইমেনশনে ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ঘটনা, সঙ্গে সুতার মতো জুড়ে আছে এক দশকের জটিল দক্ষিণ এশীয় সংঘাত। বলা যায়, একজন টেলিপ্যাথিক, রাগী গল্পকার তার জীবনের গল্পের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতের গল্প বলা। কিংবা এক জার্মান-পলিশ নাৎসি যুগের বামন যে তার গলার স্বর দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলতে পারে, তার আত্মজীবনী। অথবা স্তালিনের রাশিয়া নিয়ে লেখা এক বিবিধ-ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক রম্যরচনা।

রুশদির ‘মিডনাইটস্ চিলড্রেন’, গ্রাসের ‘টিন ড্রাম, এবং বুলগাকভের ‘মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’র মতো করুনাতিলাকা’র ব‌ই তার সাহিত্যিক প্রচলিত ধারার বিরোধিতা সম্বন্ধে সর্বাত্মক আত্মবিশ্বাসী; আর এক‌ইভাবে শ্রীলঙ্কার সাধারণ জীবনের স্বকীয়তা বজায় রেখেও এটি রাজনীতি, ইতিহাস, ধর্ম, মিথলজির মতো গুরুতর বিষয়গুলো নিয়ে আসতে পেরেছে। যেমন, জিম রিভসের রেকর্ড এবং বিস্কিট পুডিংয়ের ছাড়া ছাড়া, এসবের টুকটাক বর্ণনা আমাকে ১৯৮০’র দিকের বৃহত্তর টরোন্টোর পারিবারিক পার্টির সময়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু সব জায়গার পাঠকরাই তাদের কিছু নির্দিষ্ট চাহিদা এই ব‌ইয়ে খুঁজে পাবে, যেসব তারা মহৎ ব‌ইয়ে খুঁজে পায়: একটা অজানা দুনিয়ার নিজস্ব বিবরণের যেই পরিপূর্ণতা, ও অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনার শিহরণ, এবং এর মধ্যে যাপন।

মালি সম্ভবত পশ্চিমা উদার পাঠকদের কাছে একটু বেশিই পারফেক্ট নির্দেশক: একজন স্ব-বিনয়ী, অভদ্র, খোদাহীন সমকামী ব্রাউন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। হত্যার কারণ, সে এমন এক ব্যক্তি যে তার জুয়ার অভ্যাস ও কাম তাড়না পরিতৃপ্ত করার জন্য যেমন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তেমন‌ই সাম্প্রদায়িক ক্ষিপ্ততা অতিক্রম করা এবং এসবের পরিণতি তার কাজে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যেও। ‘আমি সেখানে ছিলাম শুধু সাক্ষী হয়ে। এই-ই যা।’ মৃত মালি এই বক্তব্যটি দেয় যখন ঘটনা ‘স্ট্রেঞ্জার থিঙস’-এর মতো একটা পাল্টা মোড় নেয়। ‘দ্য সেভেন মুনস্ অব মালি আলমেইদা’ প্রকৃতপক্ষে সাহিত্যিক-রাজনৈতিক-নৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং সেগুলো উপভোগ করার একটা দারুণ কম্বিনেশন দিয়েছে পাঠকদের, যার সঙ্গে মিশে আছে সময়সীমার এক অনুভূতি।

একজন চরিত্র লক্ষ করলো যে সে এরকম খারাপ দশায় শ্রীলঙ্কাকে কখনও দেখেনি, শুধু বলার জন্য বলা ‘এই দশা আরও খারাপের দিকে যাবে’, এই ভাবনার জন্ম ২০০৯-এর বিতর্কিত যুদ্ধের অভিশাপ থেকে, এবং বর্তমানের শ্রীলঙ্কার আর্থিক ও রাজনৈতিক ঝামেলা থেকে। কিন্তু এর থেকেও উপন্যাসটির গ্রহণযোগ্য ব্যাপারটি হলো, চরিত্রগুলোর এই বিধ্বস্ততার মধ্য থেকে সুখ খুঁজে বের করে নিয়ে আসা। দান্তে স্টাইলে গালগল্পের মধ্যে মধ্যদেশীয় ক্যান্ডির রুফটপে মালির সঙ্গে দেখা হয় এক ‘ফাইভ টাইগার চাইল্ড সৈন্যের, যে কলম্বোতে পুনর্বাসন ও জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে গিয়েছে’ এবং এর বদলে সে বিষপান করেছে। কিন্তু মালি ঝকমকে বিদ্রুপের সঙ্গে আমাদের এতটুকু নিশ্চয়তা দেয় যে, ‘তা এই পরকালকে ভালোবাসে (এখানে কেউ তাদের কোন আদেশ করতে পারে না)’ এবং তারা সেই ছাঁচ দিয়ে বাচ্চাদের মতো উল্লাস করে ঝাঁপ দেয়।

শেহান কারুনাতিলাকা

 

এক নজরে শেহান কারুনাতিলাকা:

১৯৭৫ সালে শ্রীলঙ্কার গালে শহরে জন্ম নেওয়া শেহান করুণাতিলাকা বেড়ে উঠেছেন রাজধানী কলম্বোতে। পড়াশোনা করেছেন নিউজিল্যান্ডে। বসবাস ও কাজ করেছেন লন্ডন, আমস্টারডাম ও সিঙ্গাপুরে। বর্তমানে তিনি শ্রীলঙ্কায় থাকেন।

বিশ্ব সাহিত্যের মঞ্চে শেহান করুনাতিলাকার আবির্ভাব ২০১১ সালে। সে বছর তিনি তার প্রথম উপন্যাস ‘চায়নাম্যানে’র জন্য কমনওয়েলথ বুক প্রাইজ, ডিএসএল এবং গ্র্যাটিয়ান পুরস্কার পান। বইটিকে ক্রিকেট বিষয়ক সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা বই হিসেবে ঘোষণা করে উইজডেন।

তার গান, স্ক্রিপ্ট ও গল্প রোলিং স্টোন, জিকিউ এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেছেন এবং ইন্ডিপেনডেন্ট স্কয়ার নামে একটি ব্যান্ডে গিটারও বাজিয়েছেন।

শেহান কারুনাতিলাকার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য সেভেন মুনস অব মালি আলমেইডা’ ২০২২ সালে বুকার পুরস্কার অর্জন করে।