ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনে বাংলা একাডেমির লনে অনুষ্ঠিত ‘কালচারাল ওয়ারস’ শীর্ষক সেশনে রণবীর সিধুর সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সারাহ চার্চওয়েল, নীলাঞ্জনা রায় এবং ভিভেক মেনেজেস। উপমহাদেশসহ সারা বিশ্বেই মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ কমবেশি আছে। মূলধারার গণমাধ্যম সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ না করতে পারলেও বিকল্প ধারার মিডিয়া তার স্থান নিচ্ছে নিজের মতো করে। সঞ্চালক রণবীর সিধু এভাবেই সেশনের সূচনা করেন এবং পুরো আলোচনায় গণমাধ্যমের মত প্রকাশ ভিত্তিক সংস্কৃতির টানাপোড়েন ও ক্যান্সেল কালচার বিষয়ক আলোচনা হবে জানিয়ে উপস্থিত সকলে স্বাগত জানান।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আমেরিকান লিটারেচার বিভাগের অধ্যাপক সারাহ চার্চওয়েল তার বক্তব্যে বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া সংস্কৃতির বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতেই নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সে দেশের সরকার প্রত্যেককে এর জন্য আইনি সুরক্ষা দিতে বাধ্য। এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ সবাই তা পেয়ে আসছেন। সেন্সরশিপের বেড়াজাল সেখানে না থাকলেও বর্তমানে সরকারকে কখনও কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমগুলোতে কিছুটা কর্তৃত্ব পরায়ণ আচরণ করা হচ্ছে। এর জন্য তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিত হয়ে জনতার একাংশের সৃষ্ট কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে দায়ী করেন। আদর্শ গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক। তবে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করার উপর জোর দেন তিনি।
সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে আলোচনা করতে সঞ্চালক অনুরোধ করেন প্রখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নীলাঞ্জনা রায়কে। তিনি বলেন, ‘মানুষের কল্পনাশক্তি অসীম, কোনও শৃঙ্খল তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সাহিত্যিক সরাসরি সচরাচর সেন্সরশিপের শিকার না হলেও চারপাশের সমাজে যা ঘটে অর্থাৎ ক্যান্সেল কালচারের বিরূপ প্রভাবে তাদের লেখার গড়ন বদলে যায়।’
মি-টু আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবীতে নারীরা তাদের সাথে যুগ যুগ ধরে ঘটে চলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একত্রিত হতে পেরেছেন। তবে এর কিছু অপব্যবহারও হয়েছে, ফলে জনমনে এ বিষয়ে সংশয়েরও সৃষ্টি হয়েছে। ভিভেক মেনেজেস বলেন, ‘আমি পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখি। আমি টের পাই যে সবসময়ই আমার লেখা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, অযাচিত সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সারা বিশ্বেই চলছে।’
সাহিত্যে ও গণমাধ্যমে ভাষার ব্যবহারের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সারাহ চার্চওয়েল বলেন, ‘আমি আমেরিকার গৃহযুদ্ধ বিষয়ে লিখেছি, এতে কৃষ্ণাঙ্গ সমকাম ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট শব্দ ব্যবহার নিয়ে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ভেবেচিন্তে সংবেদনশীলতার সাথে শব্দ চয়ন করতে হয়েছে।’
আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার সাহিত্যকর্মে জোরালো ও প্রথাবিরোধী শব্দের সার্থক ব্যবহার করেছেন। এই ধারা বর্তমান সময়ে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এভাবেই সংস্কৃতিকে গড়ে নিতে হয়। এতসব দুর্বিপাকেও আশার আলো দেখেন নীলাঞ্জনা রায়। তিনি মনে করেন, পৃথিবীতে ফ্রিডম অব স্পিচ নিয়ে আলোচনা খুব পুরনো নয়। এর আগে সৃজনশীল মানুষেরা কখনোই ভাবতে পারেননি যে এই শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব। তারপরেও তো শিল্প সাহিত্যের বিকাশ থেমে থাকেনি।