ছুটির দিনে সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর ঢাকা লিট ফেস্ট

দেশ-বিদেশের সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় দ্বিতীয় দিনেও মুখর ছিল ঢাকা লিট ফেস্ট-২০২৩। দশম এই আসরের দ্বিতীয় দিনে নির্ধারিত সেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্টলেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে শীত উপেক্ষা করেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে হাজির হন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসহ শিল্পের বিভিন্ন শাখার মানুষজন। সন্ধ্যার দিকে শিল্পী-সাহিত্যিক ও সাহিত্য অনুরাগীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ফেস্ট এলাকা।

সকাল ৯টায় শাহ সুফি সরদার আমির উদ্দিন চিশতীর সুফি সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম। সংগীত পরিবেশন করেন সরদার আফসার উদ্দিন। 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

এরপর সকাল ১০টায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে উদ্ভাবনী আলাপে বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার সঙ্গে আলাপে মজেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় আরও তিনটি সেশন, যার মধ্যে ছিল শিশুদের জন্য গল্প বলার সেশন। ‘আগামীর আখ্যান’ নিয়ে আলাপ করেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হক মিলন, সঞ্চালনা করেন কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

এরপর সকাল সোয়া ১১টায় ভারতীয় লেখক ও সাহিত্য সমালোচক অমিতাভ ঘোষের সঙ্গে আলাপে বসেন ঢাকা লিট ফেস্টের প্রযোজক ও পরিচালক সাদাফ সায্। পাশাপাশি সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করেন দেশবরেণ্য সাংবাদিকরা। দুপুর সাড়ে ১২টায় দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে যুক্ত হন সাফ ফুটবল বিজয়ী নারী দলের সদস্যরা। শিশুদের জন্য একই সময়ে ‘পাপেট শো’ পরিবেশন করেন প্রখ্যাত শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

দুপুর পৌনে ২টায় লেখার স্বাধীনতা নিয়ে আলাপ করেন আলোচকরা। সাংস্কৃতিক যুদ্ধ নিয়ে আলাপ করেন যুক্তরাজ্যের অধ্যাপক সারাহ চার্চওয়েল। দুপুর ৩টায় সোমালি লেখক নুরুদ্দিন ফারাহ’র মুখোমুখি হন ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক ড. কাজী আনিস আহমেদ। একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় ওটিটি কন্টেন্ট নিয়ে আলোচনা। বিকাল সাড়ে ৫টায় ব্রিটিশ অভিনেত্রী টিল্ডা সুইনটনের সঙ্গে আলাপে বসেন ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবার। এছাড়া সারাদিন শিশুদের জন্য নানা আয়োজনের পাশাপাশি ছিল সংগীত পরিবেশনা এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

লিট ফেস্টে এসেছিলেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বায়োটেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নাঈম রাহাত। তিনি বলেন, ‘নতুন জায়গায় এলে নতুন কিছু জানা যায় শেখা যায়। লিট ফেস্টে এসে অনেক নতুন বই সম্পর্কে জেনেছি। যেগুলো ভালো লেগেছে তা সংগ্রহ করেছি। ফেস্ট থেকে ওন ডেইজ লাইক দিস নামের একটা কবিতার বই নিয়েছি। আমি নিজেও লেখালেখি করি। অনুভূতির বিবর্তন নামে আমার একটি কবিতার বই প্রকাশ হয়েছে।’ লিট ফেস্টের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ও সন্তোষ প্রকাশ করেন এই শিক্ষার্থী।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

ঢাকা লিট ফেস্টে অংশ নিতে জাপান থেকে আসা রেইমান নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘গতকাল মিস করেছি। প্রথমবারের মতো আমি লিট ফেস্টে এসেছি। চমৎকার লাগছে। যদিও আমরা বাংলা সাহিত্যে সম্পর্কে কিছু জানা নেই, তাই এ নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। বাঙালি কর্তৃক লেখা ফরেনার সম্পর্কিত কিছু বই নিয়েছি। সকাল থেকে ঘুরছি ভালো লাগছে।’ 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী লুনা আক্তার বলেন, ‘ভোরে কুয়াশার মধ্যে মায়ের সঙ্গে এখানে এসেছি। মা তার পছন্দের জিনিসপত্র কিনছেন। আমি ঘুরে ঘুরে আমার পছন্দের বই কিনেছি। প্রেস লিমিটেড থেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পলিটিক্যাল অটোবায়োগ্রাফি ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স নিয়েছি। এছাড়া সিক্স সিজনস রিভিউ নামক একটি পয়েম ও ফিকশনের বই নিয়েছি। এতো এতো বই দেখে খুব এক্সাইটেড ছিলাম। মন চেয়েছে সবগুলো বই কিনে নেয়। তবুও আজ আটটি বই সংগ্রহ করছি। কাল আবার আসবো। আরও কিছু বই নেওয়ার আছে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সকল মেলা বা ফেস্টের চেয়ে লিট ফেস্টে আমি সবচেয়ে বেশি এনজয় করেছি।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

লিট ফেস্টে একমাত্র মেয়ে সোনিয়াকে নিয়ে ঘুরতে ও ইংরেজি সাহিত্যের বই সংগ্রহ করতে এসেছেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের লেকচারার মেহেরিন মাহবুব। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের বাংলার চেয়ে ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ বেশি। এই ফেস্টে অনেক ভ্যালুয়েবল ও আনকমন বই পাওয়া যায়। তাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছি। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এই ফেস্টে আসা। পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি স্ট্যান্ডার্ড আয়োজন হয়েছে। আশা করছি আগামীতে আরও বেশি সুন্দর আয়োজন হবে।’

ঢাকা লিট ফেস্টের টাইটেল স্পন্সর হিসেবে থাকছে বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন। সেই সঙ্গে প্লাটিনাম স্পন্সর হিসেবে আছে দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেড এবং স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে থাকছে ব্রিটিশ কাউন্সিল।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

অনলাইন রেজিস্ট্রেশন ও সরাসরি টিকিটের লোকেশন জানতে লগইন করতে হবে www.dhakalitfest.com ওয়েবসাইটে। এবারের আয়োজনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন হবে টিকিটের। ২০০ এবং ৫০০ টাকায় টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইনে এবং সশরীরে টিকিট কেনার সুযোগ থাকছে। এছাড়া বাংলা একাডেমির মূল প্রবেশমুখে থাকছে স্পট রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা। ১২ বছরের কম বয়সী ও শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবেন।

অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে টিকিট কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় পাওয়া যাবে এগুলো।

লিট ফেস্টে শিশু। ছবি: নাসিরুল ইসলাম

যেসব স্থানে টিকিট পাওয়া যাবে– ঢাকা লিট ফেস্ট অফিস (নিকেতন, ঢাকা), মীনা সুইটস (বনানী এক্সপেরিয়েন্স জোন এবং পান্থপথ শাখা), মীনা বাজার (ধানমন্ডি ২৭, উত্তরা আউটলেট, ইসিবি চত্বর আউটলেট, শান্তিনগর আউটলেট, বনশ্রী এবং মগবাজার আউটলেট), বাংলার মিষ্টি (বনানী ও গুলশান আউটলেট), আড়ং (মিরপুর, গুলশান ও উত্তরা আউটলেট) এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

www.dhakalitfest.com লিংকে ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। এজন্য উল্লেখ করতে হবে দর্শনার্থীর নাম, বয়স, লিঙ্গ, পেশা, মোবাইল নম্বর এবং ইমেইল ঠিকানা। সব তথ্য সঠিকভাবে দেওয়ার পর টিকিট ক্যাটাগরি নির্বাচন করতে হবে।

ঢাকা লিট ফেস্টের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে জানানো হয়েছে, টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দৈনিক জনপ্রতি ৫০০ টাকা। তবে একসঙ্গে চার দিনের টিকিট নিতে চাইলে ছাড় মিলবে ৫০০ টাকা, সেক্ষেত্রে একেক জন দর্শনার্থী ১৫০০ টাকায় চারদিনের টিকিট পেয়ে যাবেন।

এদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সুখবর। তারা প্রতিজন ২০০ টাকায় টিকিট কিনতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের বেলায় একসঙ্গে চার দিনের টিকিট কিনলে লাগবে ৫০০ টাকা, অর্থাৎ তাদের জন্য থাকছে ৩০০ টাকা ছাড়।