গত বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা, এমনকি পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়। এ নিয়ে বছরজুড়েই সমালোচিত ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতর। এ কারণে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সেই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে প্রশ্নফাঁসকারী চক্র। পরীক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ফেসবুকে প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। পরীক্ষায় শতভাগ প্রশ্ন কমন পড়লেই পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী টাকা নেওয়া হবে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে ওইসব পোস্টে।
শুধু তাই নয়, প্রশ্নপত্র নিতে আগ্রহীদের উদ্দেশ করে ওইসব পোস্টে বলা হচ্ছে— প্রশ্নপত্র পেতে ফেসবুকে গোপন গ্রুপে কেবল পরীক্ষার্থীকেই যুক্ত করা হচ্ছে। আর গ্রুপে যুক্ত করার আগে আগ্রহীরা এলেই পরীক্ষার্থী কিনা তা যাচাই-বাছাই করে নিচ্ছে অ্যাডমিন। যাচাই করতে পরীক্ষার্থীর প্রবেশপত্রের ছবি তুলে অ্যাডমিনের ফেসবুক ইনবক্সে দিতে বলা হচ্ছে। এরপর অ্যাডমিন প্রবেশপত্র যাচাইয়ের পরই কেবল ওই প্রার্থীকে গ্রুপে যুক্ত করছেন। তারপর প্রশ্নপত্র দেওয়া নিয়ে দেনদরবার হচ্ছে।
একটি ফোন নম্বর দিয়েও যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে ওই পোস্টে। প্রশ্নপত্র উত্তরসহ ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক, এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসেও পাঠানো হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় যথাযথ ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। পরীক্ষা শুরুর সাত দিন আগে থেকেই কোচিং সেন্টার বন্ধের ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া নিয়ম করা হয়েছে, পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব ছাড়া অন্য কোনও শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বহিষ্কার করা হবে। মন্ত্রী বলেছেন, ‘ফেসবুকে প্রশ্ন পাওয়া গেলে প্রয়োজনে ফেসবুক বন্ধের বিষয়ে বিটিআরসি’র সহযোগিতায় তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া গোয়েন্দারাও বিভিন্ন মাধ্যমে নজরদারি করবেন।’
রাজধানীর গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে এবার পরীক্ষা দেবে রাইসা নামে এক শিক্ষার্থী। তার বাবা আলতাফ চৌধুরী বলেন, ‘ফেসবুকে এর আগে পরীক্ষা শুরুর এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগেই প্রশ্ন পাওয়া গেছে। কিছু কিছু প্রশ্ন পরীক্ষার আগের রাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে প্রশ্নফাঁস হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। অব্শ্য প্রশ্নফাঁসের ভিড়ে কেউ কেউ ফেসবুকে গুজবও ছড়ায়। অনেকেই প্রশ্নফাঁসের সুবিধা নিতে চায়। ফেসবুকে ফোন নম্বর দিয়ে বিকাশে টাকা পাঠাতে বলে। তাদের বেশিরভাগই প্রতারক। প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই এই গ্রুপের উদ্দেশ্য।’
অন্যদিকে রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক অমূল্য কুমার বৈদ্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার প্রশ্নফাঁস রোধে বিভিন্নভাবে কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু প্রশ্নফাঁস ঠেকানো যাবে না বলেই আশঙ্কা হচ্ছে। কারণ ইতোমধ্যে যতবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই চক্র অনেক বেশি তৎপর। ফেসবুক ও কোচিং সেন্টার বন্ধ করে তেমন কোনও ফল হবে না বলেই আমার মনে হয়।’
প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদ ও শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীও। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যদিও সরকার এবার অন্যান্যবারের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন, তবুও প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা থেকেই যায়। কারণ সরকার যতই সচেতন হোক না কেন, অসাধু চক্র আরও বেশি সক্রিয়। তারা নতুন নতুন পথ অবলম্বন করতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।’
শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী আরও বলেন, ‘মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু বিষয় তো সরাসরি তাদের হাতে নেই। যেমন, এবার সারাদেশে পরীক্ষা হচ্ছে একই প্রশ্নে। এটা যেমন ইতিবাচক, তেমনই কোথাও যদি প্রশ্নফাঁস হয় তাহলে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা যথাযথভাবে মনিটরিং না করা হলে প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।’
প্রশ্নফাঁসের ব্যাধি থেকে দেশকে রেহাই দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে পুলিশ প্রশাসনসহ সব শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। তবে দু’একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেই বোঝা যাবে সরকারের এই কঠোর অবস্থান কতটা। প্রশ্নফাঁস হলেও বোঝা যাবে। তবে আমরা মনেপ্রাণে চাই, দেশ যেন এই ব্যাধি থেকে বের হতে পারে।’
প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কার বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যতটা সতর্ক অবস্থানে থাকা সম্ভব, আমরা আছি। এজন্য আত্মবিশ্বাস আছে— প্রশ্নফাঁস হবে না।’
তবে ফেসবুকে ইতোমধ্যে প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচারণা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বোর্ডের পদক্ষেপ কী? উত্তরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বললেন, ‘ফেসবুক নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিটিআরসিকে জানিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়া গোয়েন্দারাও নজরদারিতে রেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেবেন তারা।’
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ২০ লাখ ৩১ হাজার ৮৯৯ পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ১০ লাখ ২৩ হাজার ২১২ জন, ছাত্রী ১০ লাখ ৮ হাজার ৬৮৭ জন।