শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়

১১ নারী শিক্ষকসহ ১২ জনকে চাকরিচ্যুত করলো অ্যাডহক কমিটি

রাজধানীর শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় থেকে দুই দফায় ১১ জন নারী শিক্ষক ও একজন পুরুষ শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছে অ্যাডহক কমিটি। এক্ষেত্রে কমিটির বিরুদ্ধে বিধি না মানার অভিযোগ উঠেছে।

চাকরিচ্যুত শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টরা জানান, বিধি অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটি সাধারণত রুটিন দায়িত্ব পালন করে থাকে। কমিটি কাউকে চাকরি দেওয়া বা চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতা রাখে না।

চাকরিচ্যুত ১০ জন নারী শিক্ষক জানান, তাদের কারণ দর্শানো নোটিশ বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। সরাসরি ১০ জন নন-এমপিও শিক্ষককে স্থায়ী চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার এহসানুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অ্যাডহক কমিটি নিয়োগ দিতে পারে না, কাউকে চাকরিচ্যুতও করতে পারে না। প্রতিষ্ঠান-প্রধান কী নিয়ম-কানুন জানেন না? চাকরি যাওয়ার মতো পরিস্থিতি থাকলেও অ্যাডহক কমিটি কারও চাকরি খেতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত টিকবে না।’  

জানা গেছে, গত ১ জুন রাজিব দাস এবং আকলিমা আক্তার নামে দুই শিক্ষককে প্রথম দফায় চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর সোমবার (১৮ আগস্ট) রেজিস্টার্ড চিঠির মাধ্যমে চাকরিচ্যুতির চিঠি পান আরও ১০ জন নারী শিক্ষক।

চাকরিচ্যুত শিক্ষক আকলিমা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি নাকি উচ্চস্বরে কথা বলেছিলাম। সে কারণে শোকজ করা হয়েছিল। জবাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরে আমি অভিযোগ করেছি। প্রতিকার না পেলে মামলা করবো।’

দ্বিতীয় দফায় চাকরিচ্যুত ১০ জন হলেন—মাধ্যমিক শাখার সহকারী শিক্ষক সায়নিকা আক্তার, সহকারী শিক্ষক মাজেদা খানম, রাজিয়া সুলতানা, সৈয়দা মেহেনাজ নাইয়ারা ও রেখা রানী মণ্ডল, প্রাথমিক শাখার শিক্ষক আলেয়া আক্তার, জ্যোৎস্না আক্তার, ঝর্ণা রানী মণ্ডল, সামিনা আফরোজ এবং সোমা রানী চন্দ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শুরু হয় শিক্ষকদের জোর করে চাকরিচ্যুত এবং লাঞ্ছিত করার ঘটনা। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ঘটনা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

গত ১৫ আগস্ট ‘চাকরি হারানোর আতঙ্কে শেরেবাংলা গার্লসের ২৫ শিক্ষক’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর কয়েক দিন পর ১০ জন শিক্ষক চাকরি হারালেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, বেশ কিছু দিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই চাকরিচ্যুত করা হয় আকলিমা নামে একজন শিক্ষককে। গত ১ জুন চাকরিচ্যুতির পর স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ২৫ জন শিক্ষককে নতুন করে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দুই দফায় খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং এসব শিক্ষককে খণ্ডকালীন হিসেবে আবেদনের জন্য নোটিশ করা হয়। ২৫ জনের মধ্যে ১৪ জন শিক্ষক চাকরি হারানোর ভয়ে খণ্ডকালীন হিসেবে নিয়োগ পেতে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন। বাকি ১১ জন শিক্ষক চাকরি হারানোর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটান। এরই একপর্যায়ে ১০ জন শিক্ষক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। সেই ১০ জন শিক্ষককে এবার চাকরিচ্যুত করা হলো।

এর আগে ওই ১০ জন শিক্ষক বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগে জানান, গত ২৫ জুলাই সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রাসেল মাহমুদ খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেন। শিক্ষকদের অনেকেই বুঝতে না পেরে পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৫ জন নন-এমপিও শিক্ষকদের মধ্যে ১৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বেতনের সঙ্গে সংযুক্ত প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুয়েটি অবসর ও কল্যাণ ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চাকরিচ্যুত প্রাথমিক শাখার শিক্ষক আলেয়া আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি চাকরিতে যোগদান করি ২০১০ সালে। আমাকে স্থায়ী করা হয় ২০১৬ সালে সালে। বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাই। অথচ চাকরির প্রায় ১৬ বছরে এসে আমাকে বলা হয়—নিয়োগ ঠিক নেই, খণ্ডকালীন হিসেবে নতুন করে আবেদন করতে হবে। আমার মতো ভুক্তভোগী সবাইকে একই কথা বলা হয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালে চাকরিচ্যুতির অংশ হিসেবে শিক্ষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল প্রতিষ্ঠান থেকে। তখন আমরা অনেকেই আবেদন করেছিলাম। কলেজ শাখায় নিয়োগ দেওয়া হলেও মাধ্যমিক বা প্রাথমিক শাখায় তখন নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

আলেয়া আক্তার আরও বলেন, ‘এবার দুই দফায় ১৪ জন এবং ৪৪ জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। আমরা সবাই জানি অ্যাডহক কমিটি নিয়োগ দিতে পারে না। এত বেশি সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ রহস্যজনকও মনে হয়েছে। অথচ আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমরা এবার যে ১০ জন স্থায়ী শিক্ষক খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে আবেদন করিনি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি, তাদের সবাইকে এক নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হলো।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

জানতে চাইলে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় গভর্নিং বডির (অ্যাডহক) সভাপতি জাকির হোসেন কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আপনি অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন, উনি আপনাকে সব তথ্য দিতে পারবেন। আমি বাইরে আছি, কাজে ব্যস্ত।’

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক অধ্যক্ষ রাসেল মাহমুদ হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলেজে এসে এগুলো শোনেন। ফোনে এসব বলতে পারি না, সমস্যা হয়।’

১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করে বলেন, এগুলো আগের বিষয়।’

শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির আতঙ্কের বিষয়ে এর আগে এই অধ্যক্ষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। আমার দায়িত্ব পাওয়ার আগেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে এলে বিস্তারিত জানতে পারবেন, সেক্ষেত্রে গ্যাপ থাকবে না।’

ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে বিশৃঙ্খল অবস্থা

শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, নারীদের জীবন-মান উন্নয়ন ও নারী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে ১৯২৮ সালে ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ নামে প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন লীলাবতী নাগ। তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটি নাম পাল্টে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় করা হয়। পরবর্তী সময়ে কলেজ শাখা খোলা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়।