সকালে কাঁঠালবাগান ঢালের খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান শেষ হতেই দুপুরের পর একই ভবনে শুরু হয় বাংলামোটরের খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। সোনারগাঁও লিংক রোডে নিজস্ব ভবনের নির্মাণকাজ চলায় খোদেজা খাতুন বিদ্যালয়টিকে সাময়িকভাবে অন্য স্কুলে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তবে শুধু ভবনের সংকটই নয়, দুটো স্কুলের একটিরও নেই কোনও খেলার মাঠ। অপরদিকে মোহাম্মদপুরের বরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও একই— সামনে যে ছোট্ট আঙিনা রয়েছে, তাও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত রাখার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও দেশের বেশিরভাগ স্কুলেই নেই কোনও খেলার মাঠ। ফলে খেলাধুলা ছাড়াই কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে হচ্ছে।
ঢাকায় ২৫২, সারাদেশে ১০,৭৪০ স্কুলে মাঠ নেই
সরেজমিনে বাংলামোটরের খোদেজা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন নতুন ভবনের নিচতলায় ছোট পরিসরে শিক্ষার্থীদের অ্যাসেম্বলি বা কিছুটা সময় কাটানোর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। তবে ফুটবল বা ক্রিকেটের মতো খেলা কোনও ভবনের নিচতলায় বা বদ্ধ জায়গায় সম্ভব নয়। বর্তমানে কাঁঠালবাগানের খান হাসান আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন এবং খোদেজা খাতুন বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক। উভয় স্কুলেই মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা খোলা বাতাসে দাপাদাপির সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সংকট শুধু এই কয়েকটি স্কুলেই সীমাবদ্ধ নয়। সারাদেশের ১০ হাজার ৭৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনও ধরনের খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে সংকটজনক। ঢাকার ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিরই নিজস্ব কোনও খেলার মাঠ নেই; মাত্র ৯০টি বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ রয়েছে। ফলে শুধু ঢাকাতেই আড়াই শতাধিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের অ্যাসেম্বলি এবং খেলাধুলার বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে।
বিকল্প ব্যবস্থা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মাঠ সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে রমনা থানা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আজিজা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যেসব স্কুলে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোর নিচতলা খোলা রাখা হচ্ছে যেন বাচ্চারা অন্তত কিছুটা নিষ্কৃতি পায় এবং সেখানেই অ্যাসেম্বলি বা সীমিত খেলাধুলা করতে পারে। আর বড় পরিসরে খেলার জন্য এলাকার অন্য কোনও স্কুল বা কাছাকাছি খেলার মাঠের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করার নির্দেশনা রয়েছে।”
একই কথা জানান কুষ্টিয়ার সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোছা. শাহানাজ বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যেসব স্কুলে নিজস্ব মাঠ নেই, তাদের পার্শ্ববর্তী অন্য কোনও স্কুল বা এলাকার খোলা মাঠ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
২০২৭ সাল থেকে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে খেলাধুলা
স্কুলগুলোতে মাঠের এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিশুদের ক্রীড়ামোদী করে গড়ে তুলতে খেলাধুলাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং এটি বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “২০২৭ সাল থেকে পাঠ্যক্রমে খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শহরের স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ না থাকাটা আমাদের সবচেয়ে বড় মৌলিক সংকট। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা হবে। ২০২৭ সালের মূল বই প্রস্তুত হয়ে যাওয়ায় এটি আলাদাভাবে বা কিছু দিন পর থেকে যুক্ত করা হতে পারে।”
শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ
স্কুলে খেলার মাঠ না থাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মোহাম্মদপুরের একটি সুবিধা বঞ্চিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছে যখন জানতে চেয়েছিলাম তারা কে কী হতে চায়— কেউ বলেছে ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, আর একজন বলেছিল ক্রিকেটার হতে চায়। যখন জিজ্ঞেস করলাম, ক্রিকেট খেলো কোথায়? মাঠ আছে? তারা উত্তর দিলো, মাঠ নেই। মোহাম্মদপুরের এসব বাচ্চা তাহলে কীভাবে তাদের স্বপ্ন পূরণ করবে?”
তিনি আরও বলেন, “সরকার দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখছে এবং দেখাচ্ছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে মাঠের সংকট ও অবকাঠামোগত এই বাস্তবতাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। গ্রাম এলাকায় না হলেও শহরের স্কুলগুলোতে দ্রুত বিকল্প খেলার জায়গার সংস্থান করা জরুরি।”