করোনাকালে ‘সর্বনাশের’ শুরু, শিখন ঘাটতি পূরণ হবে কবে

এস এম আববাস
২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০০ আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯

২০২০ সালের ১৭ মার্চ করোনা অতিমারীর কারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন থেকেই দেশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি শুরু হয়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চললেও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে সেইসময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীদের শিখনে বড় ঘাটতি রয়েই যায়। অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে সেই ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করলেও ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় আবারও দীর্ঘ শিখন ঘাটতিতে পড়ে শিক্ষার্থীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, করোনা অতিমারীর সময় ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। তবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা শুরু হয়, যা দীর্ঘদিন অব্যাহত থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শিখন ঘাটতির কারণে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা অটোপাসের দাবিতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ঢুকে আন্দোলন করেন। পরে শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে সরকার করোনাকালে অনুসৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের ‘অটোপাস’ দেয়।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা অতিমারীর সময় এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হলেও সেই ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তেমন একটা ছিল না। কারণ শ্রেণি পাঠ আগেই শেষ হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর শিখন ঘাটতি রেখেই গঠিত সরকার এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটোপাস দেয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকেই নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী করা সম্ভব হয়নি। আর ২০২৫ সালের পুরো সময়জুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা অব্যাহত ছিল।

তাদের মতে, জুলাই আন্দোলন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মিলিয়ে গত দুই বছরে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিপাঠ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসও ঠিকমতো লেখাপড়া হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে সময়মতো পাঠ্যবই হাতে না পাওয়ায় শ্রেণিপাঠও ব্যাহত হয়। জাতীয় নির্বাচনের কারণে আরও তিন দিন ছুটি ছিল। ফলে জানুয়ারি থেকে ১৪ মে পর্যন্ত যে অংশের সিলেবাস শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে শিখন ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ না হলেও এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ৬ জুন শুরু হবে। গত ১৪ জুলাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৭ সালের ৭ জানুয়ারি এসএসসি পরীক্ষা শুরুর উদ্যোগ ইতিবাচক। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে ইতোমধ্যে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় শিখন ঘাটতি কাটিয়ে ঘোষিত সময়ে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরাই লাভবান হবে।

শিখন ঘাটতির কারণে কোচিংয়ে ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পূর্ণ সিলেবাস শেষ হবে কি না—এ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ থাকে। ফলে তারা সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীরা এমনিতেই কোচিংয়ে যায় না, বাধ্য হয়েই যায়। আমাদের সন্তানের শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পঠন-পাঠনের মানও খুব ভালো নয়। সময়ও কম পাবে। এ ছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষকই চান শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে পড়ুক।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে হাইকোর্টের নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কোনও শিক্ষক নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে কোচিং করাতে পারবেন না। আদালতের এ নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং করা উচিত।’

শিখন ঘাটতি মেটানো জরুরি, তাড়াহুড়ো নয়

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, ‘নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণে পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে আবার দীর্ঘ ছুটিও গেছে। তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই। সবকিছু যন্ত্রের মতো চলতে পারে না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘পড়াশোনার মান উন্নয়নে স্কুলের মনিটরিং বাড়াতে হবে। পাবলিক পরীক্ষা সামগ্রিকভাবে একটি সূচক। এর গুরুত্ব থাকবে। তবে পাঁচটি মূল বিষয়ে পরীক্ষা নিলেও মেধা যাচাইয়ে সমস্যা হবে না, বরং সেটাই ভালো হবে।’

শিক্ষাবর্ষ নিয়েও নতুন করে ভাবা দরকার বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, ‘জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভর্তি ও নতুন বই বিতরণ করতে করতেই তিন-চার মাস চলে যায়। বছরের ভালো সময়টুকু পড়াশোনায় কাজে লাগে না। উচ্চশিক্ষার মতো জুলাই-আগস্ট থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু করা গেলে বিষয়টি নতুনভাবে বিবেচনা করা সম্ভব। পাবলিক পরীক্ষাও বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা করা দরকার।’

এ বিষয়ে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘২০২৪ সালের আন্দোলনের পর মব সন্ত্রাসের কারণে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকরা তটস্থ হয়ে পড়েন। অনেক শিক্ষার্থী আন্দোলনের চেতনা থেকে সরে গিয়ে মব ও সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন করলেই দাবি আদায় হয়—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়। এর ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থীর আন্দোলনের চাপে অটোপাস দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে অটোপাসে চলে গেলেও এর ক্ষতির দিকটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’

এসব ঘটনার কারণে শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, শিক্ষাঙ্গনেরও বড় ক্ষতি হয়েছে বলেও মনে করে রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকরা এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে সময় পার করেছেন। এর প্রভাব শিখনফল ও সমাজ—উভয় ক্ষেত্রেই পড়েছে। ধীরে ধীরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও স্পষ্ট হয়েছে। এখনও সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেনি।’

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার পাশাপাশি কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, গাইড ও নোটবইয়ের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। শিখন ঘাটতি পূরণে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, পারিবারিক সহযোগিতা এবং কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ব্যবহার দেখা যায়। তবে বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে ব্যক্তিগত প্রস্তুতির ওপর নির্ভরতা কমবে। ফলে গাইডবই, নোটবই ও প্রাইভেট টিউশনের মতো বাণিজ্যিক উদ্যোগগুলোর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।‘

করোনাকালে ঘাটতি বা লার্নিং লস কাটিয়ে উঠতে সরকার ‘এক্সিলারেটেড লার্নিং’ ও ‘রেমিডিয়াল লার্নিং’-সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়েও অনুরূপ উদ্যোগ নিয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা যেতে পারে।’

কে এম এনামুল হকের মতে, বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে কন্টাক্ট আওয়ার বাড়াতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে এ বছর দশম শ্রেণিতে প্রতিদিন এক ঘণ্টা ক্লাস বাড়ানো যেতে পারে। প্রয়োজনে সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়েও কন্টাক্ট আওয়ার বাড়ানো প্রয়োজন। শিখন ঘাটতি পূরণ ছাড়া বিকল্প নেই। একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ‘দেশের প্রাইমারি শিক্ষার কারিকুলামে অনেক ঘাটতি রয়েছে এবং তা শিশুদের জন্য বেশ কঠিন।’

তিনি আরও জানান, সরেজমিনে স্কুল পরিদর্শন করে তিনি দেখেছেন, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই বই থেকে পড়ে তা বোঝা বেশ কষ্টসাধ্য। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবের চেয়ে বাস্তবে আরও বেশি শিক্ষার্থী শিখনে পিছিয়ে আছে।

ঘাটতি পূরণে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘাটতি উত্তরণে গৃহীত পদক্ষেপএই ঘাটতি (লার্নিং ডেফিসিট) কমিয়ে আনতে মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কিছু সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কারিকুলাম পুনর্বিন্যাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিয়মিত তদারকি। কারিকুলাম পুনর্বিন্যাসে পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। শিক্ষক প্রশিক্ষনে শিক্ষকদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার সবাড়াতে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের প্রসার ঘটানো হচ্ছে। আর নিয়মিত তদারকির জন্য মাঠপর্যায়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও রেমিডিয়াল শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’

/ইউএস/
সম্পর্কিত
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেলফি তুলতে গাড়ি থামালেন প্রধানমন্ত্রী, দিলেন উপহার
ফ্রান্সে সহিংসতার জেরে জরুরি মন্ত্রিসভা বৈঠক, পদত্যাগ করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী?
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সর্বশেষ খবর
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
ইশরাকের কাজের উদ্দেশ্য ভালো হলেও হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়াটা ঠিক হয়নি: স্পিকার
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
স্পেনের যে গুহায় পাথরের গায়ে আদিম মানুষের শিল্পকর্ম
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
এসআইয়ের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা, ৯৯৯-এ ফোনে উদ্ধার ভুক্তভোগী
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
ঘুষ দাবির অভিযোগে থানা থেকে এএসআই প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ