আরও নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন কী

দেশে নতুন করে আরও ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে চলতি বছরের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) আলোচনা শুরু হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও আইনি শর্ত পূরণের বিষয়ে ইউজিসির মতামতও চাওয়া হয়। এরই মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক অনুমোদন পেয়েছে। ফলে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এখনও পৌঁছেনি।

দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটির কোনও কার্যক্রমে নেই। এতগুলো থাকার পরও নতুন করে আরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কেউবা বলছেন, ‘এত বিশ্ববিদ্যালয়ের একদমই প্রয়োজন নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাওয়া ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইইউএসটি) গত আগস্টে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক সরকারি অনুমোদন পেয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশনের (ইএসডিও) উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

এর আগে গত জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন সময়ে নতুন ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিষয়ে ইউজিসির মতামত জানতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছয়টির বিষয়ে ২৭ জানুয়ারির একটি চিঠিতে ইউজিসির মতামত চাওয়া হয়। পরে আরও পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়েও আলাদাভাবে মতামত চাওয়া হয়।

ইকো ইউনিভার্সিটি অনুমোদন পাওয়ার পর বর্তমানে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে, সেগুলো হলো—খুলনার নৌবাহিনী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিলেন্স, রাজশাহীর আশ্রয় ইউনিভার্সিটি ও ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নারায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জে ইউনিভার্সিটি অব ইন্টিগ্রেটেড থট, গাজীপুরে বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি, ঢাকায় যমুনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, সাভারে গ্লোরিয়াস ইউনিভার্সিটি, ঝিনাইদহে সৃজনী বিশ্ববিদ্যালয়।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যমুনা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জন্য আবেদন করেছে যমুনা গ্রুপ। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির জন্য আবেদন করেছেন সৈয়দ জাবেদ মো. সালেহ উদ্দিন। গ্লোরিয়াস ইউনিভার্সিটির জন্য কৃষিবিদ গ্রুপের পক্ষে ড. মো. আলী আফজাল, ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির জন্য আনোয়ারুল ইসলাম এবং সৃজনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এম হারুনুর রশীদ আবেদন করেছেন।

ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই চলছে। সম্ভাব্যতা, অবকাঠামো, অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা, শিক্ষক নিয়োগসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে প্রস্তাবিত হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে গঠিত কমিটির সদস্য ও ইউজিসির পরিচালক জেসমিন পারভীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘খুলনা নেভি ইউনিভার্সিটির প্রস্তাবই ইউজিসিতে আসেনি। ইউনিভার্সিটি অব এক্সিলেন্স ও আশ্রয় ইউনিভার্সিটির প্রস্তাব আসছে, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইম্পেরেল ইউনিভার্সিটির পরিদর্শন হয়ে গেছে, রিপোর্ট চলে যাবে।’’

তিনি বলেন, ‘‘রূপগঞ্জ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইন্টিগ্রেটেড থট, গাজীপুরের বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি, যমুনা ইউনিভার্সিটি ও ঝিনাইদহের সৃজনী ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে চলে গেছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির প্রস্তাব ইউজিসিতে আছে। সাভার গ্লোরিয়া ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত কেউ সাড়া দেয়নি। আর যাত্রাবাড়ীর ভ্যারিটাস ইউনিভার্সিটির পরিদর্শন হয়েছিল। এটিকে আবারও পরিদর্শনের আওতায় আনা হয়েছে।’’

অনুমোদন পেতে কী কী শর্ত

২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী নতুন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সরকার শর্তসাপেক্ষে সাময়িক অনুমতি দিতে পারে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত সাময়িক অনুমতির আদেশে দেখা যায়, প্রাথমিক অনুমতির মেয়াদ সাত বছর। এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনে নির্ধারিত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠন ও নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার ও অন্যান্য শিক্ষা-সুবিধা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ, অনুমোদিত অ্যাকাডেমিক পরিকল্পনা ও প্রোগ্রাম পরিচালনাসহ আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ।

আইনের শর্ত পূরণ করতে না পারলে সাময়িক অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করার বিধানও রয়েছে। শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়!

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১৭টি। এর মধ্যে প্রথম সারির ১০টি বাদে অন্যগুলোতে ইতোমধ্যে কমবেশি শিক্ষার্থী সংকট চলছে। এদিকে, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় আগামী দুই-তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট আরও প্রকট আকারে দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাদশ শ্রেণিতে আসন খালি থাকার বিষয়টি শুধু কলেজ পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ধারাবাহিক প্রভাব পড়বে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল, প্রকৌশলসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে ভর্তি-প্রার্থীর সংখ্যাও কমতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংকট বেশি দেখা দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও প্রভাব পড়বে না। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট হবে দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।’

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন

দেশে উচ্চশিক্ষার পরিধি বাড়লেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাস, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ করতে পারেনি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনুমোদিত পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মোট ১৭৪টি। এর মধ্যে ৫৭টি পাবলিক এবং ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৭টি হলেও এর মধ্যে বেশ কয়েকটির এখনও কোনও কার্যক্রমে নেই।

এছাড়া চলতি অধিবেশনেই এরইমধ্যে জাতীয় সংসদেও নতুন করে অন্তত ১০টি এলাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সাতক্ষীরায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে এ দাবির হিড়িক পড়ে।

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রমের মান, অবকাঠামো, শিক্ষক, অনুমোদিত প্রোগ্রাম ও আইনগত শর্ত পূরণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট এলাকার উচ্চশিক্ষার চাহিদা, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং আইন ও বিধির শর্ত পূরণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।

এ অবস্থায় নতুন ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের বিষয়ে ইউজিসির মতামত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষাবিদ, কবি ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শোয়াইব জিবরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এত বিশ্ববিদ্যালয়ের একদমই প্রয়োজন নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উল্টো দিকে চলে গেছে। শিক্ষা সবসময় পিরামিডের মতো হওয়া উচিত—নিচ থেকে বড় হয়ে ওপরের দিকে ছোট হবে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। উচ্চশিক্ষা এখন ব্যাপক হচ্ছে, অথচ নিচের স্তরের শিক্ষা সংকুচিত হয়ে গেছে। এর ফলে যোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই। সবাই ডিগ্রি নিচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার জন্যই ভর্তি করছে। কিন্তু তাদের জন্য বাজারে কাজের তেমন সুযোগ নেই।’’

তিনি বলেন, ‘‘এখন উচ্চশিক্ষা সংকুচিত করা দরকার। দুনিয়াতে উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়। যারা মেধাবী, গবেষণা করবে বা শিক্ষকতা করবে, তাদের জন্য উচ্চশিক্ষা দরকার। অন্যদের জন্য গ্র্যাজুয়েশনই যথেষ্ট। এইচএসসির পর কারিগরি শিক্ষায় চলে যাওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ।’’

অধ্যাপক শোয়াইব জিবরান বলেন, ‘‘সবাই পণ্ডিত হতে চাইছেন। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি নেওয়ার সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্কের চেয়ে সামাজিক মর্যাদার সম্পর্কই বেশি। বরং যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো ভালো করছে, সেগুলো ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’’