কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্থায়ীভাবে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) পেলে শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলে শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া বোর্ডের নিবন্ধন, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়ায়ও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে স্থায়ী টিসি পেলেই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়, বিষয়টি এমন নয়। ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর শ্রেণি, টিসি দেওয়ার কারণ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম এবং অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগের ওপর।
ভর্তি ও শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি
স্থায়ী টিসি দেওয়ার পর দ্রুত অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারলে শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় বিরতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠা কিংবা পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণে জটিলতা
নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে টিসির প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নতুন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির পাশাপাশি বোর্ডের নিবন্ধন, বিষয় নির্বাচন, নিবন্ধন স্থানান্তর এবং পরীক্ষার ফরম পূরণের মতো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রক্রিয়া শেষ করা না করা গেলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট বোর্ডের বিধি ও শিক্ষার্থীর নিবন্ধনের অবস্থার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করবে।
মানসিক ও সামাজিক চাপ
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্থায়ী টিসি দেওয়া হলে শিক্ষার্থী মানসিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে পারে। সহপাঠীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্নতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, হতাশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে কৈশোরে থাকা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তাদের পড়াশোনার আগ্রহ ও স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাড়বে পরিবারের আর্থিক ব্যয়
এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে গেলে নতুন করে ভর্তি ফি, অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ এবং প্রয়োজনে যাতায়াতের ব্যয় বহন করতে হতে পারে। কাছাকাছি উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান না পাওয়া গেলে দূরের প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের কারণে সময় ও খরচ দুটোই বাড়তে পারে। এতে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি পরিবারের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
ভবিষ্যৎ শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
টিসির কারণে ভর্তি বা পরীক্ষার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পিছিয়ে গেলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার সময়সূচি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে যথাসময়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে এসব ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকারের সুযোগ
কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্থায়ী টিসি দিলে সিদ্ধান্তটির লিখিত আদেশ, কারণ এবং কোন বিধি অনুসরণ করে তা দেওয়া হয়েছে, সেসব বিষয় যাচাই করা জরুরি। সিদ্ধান্তটি সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ কিংবা প্রতিকারের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী ছাড়পত্র ও নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় শিক্ষার্থীকে। সে ক্ষেত্রে ভোগান্তি সৃষ্টি হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের।
সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষা বিষয়ক নিবন্ধকার মো. রহমত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যাতে অকারণে ব্যাহত না হয়, সে জন্য টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ, সিদ্ধান্তের যথাযথ কারণ উল্লেখ এবং শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষার সুযোগ বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।/এসএমএ/আইএএম/