গেটম্যানকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘ডিসিতে একজন আছেন। আর নিচে আছেন আরও দুই-তিনজন। হল বড় হওয়াতে অন্ধকারে তাদের দেখা পাবেন না।’
দেশের অন্যতম আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ স্টার সিনেপ্লেক্স। লবিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই শেষ হলো হলিউড ছবি ‘ব্লাড শট’-এর শো। মাত্র ৯ জন দর্শক বেরিয়ে এলেন। অন্যদিকে শ্যামলী, মধুমিতা বা বলাকার মতো অসংখ্য প্রেক্ষাগৃহের দরজায় ঝুলছে তালা।
ঘটনাগুলো গত ২৯ অক্টোবর দুপুরের। করোনার প্রভাবে বন্ধ হওয়ার পর সিনেমা সংশ্লিষ্টদের আবেদনের সূত্র ধরে গত ১৬ অক্টোবর দেশের সব প্রেক্ষাগৃহ খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গেলো ১৫ দিনেও দেশের বেশিরভাগ প্রেক্ষাগৃহ চালুই হয়নি। যে ক’টা প্রদর্শনী শুরু করেছে সেখানে আছে দর্শক স্বল্পতা ও ছবি সংকট।
রাজধানীর স্টার সিনেপ্লেক্সের বিপণন বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলা ছবি ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’-এর দর্শক আমরা পাচ্ছি। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার (২৩ ও ২৪ অক্টোবর) হাউজফুল গেছে। বাকি দিনগুলোতে কম। কিন্তু আমাদের অন্য ছবিগুলোর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। লোকজন যারা ছবি দেখতে আসবেন, তাদের তো ভালো ছবি দিতে হবে। এ জায়গায় দ্রুত সমাধান দরকার। মানে হল খুললেই হবে না, ভালো ছবিও লাগবে।’’
তিনি জানান, দর্শকদের হলে আনতে প্রেক্ষাগৃহটি বিভিন্ন অফার দিয়েছে। এরমধ্যে ছিল এক হাজার দর্শকের জন্য অর্ধেক মূল্যে টিকিটের দাম রাখা। আছে তাদের প্রযোজিত ছবি ‘ন ডরাই’-এর জন্যও ছাড়।
কিন্তু এতে করেও খুব বেশি দিন টেকা যাবে না, যদি না ভালো ছবি মুক্তি পায়।
অন্যদিকে মধুমিতার কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ ও শ্যামলী প্রেক্ষাগৃহের ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ সাফ জানালেন, ভালো ছবি না হলে হল খোলাটা হবে বোকামি।
শ্যামলী স্কয়ারে অবস্থিত শ্যামলী প্রেক্ষাগৃহে যখন যাওয়া হয় তখন মার্কেট পুরোপুরি বন্ধ। করোনার পর তারা এখনও এটি বন্ধ রেখেছে। হলের লবিতে সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া কেউ নেই।
হল ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ বললেন, ‘এখন আমাদের কিছু স্টাফ দিয়ে হলটা মেইনটেনেন্স হচ্ছে। হল খোলা মানে আরও কিছু স্টাফ দিনভিত্তিতে নিতে হবে। এরপর এসি, স্যানিটাইজারসহ আরও অনেক খরচ আছে। এগুলোর খরচ তুলতে হলেও তো ভালো ছবি দরকার। হিরো আলমের ছবি দিয়ে সেটা তো সম্ভব নয়। আর সেটা আমাদের রেপুটেশনের সঙ্গে যায়ও না। তাই আমরা হলটি আপাতত চালু করবো না।’
প্রায় একই কথা নওশাদের, ‘সিনেমা হল খুললেই যে দর্শক আসবে তার গ্যারান্টি কী? ভালো ছবি দিয়েও তো হলিউডভিত্তিক প্রেক্ষাগৃহ সেটা করতে পারছে না। আর আমাদের তো সিনেমাই নেই। তাই প্রেক্ষাগৃহ খুলতে হলে বড় ছবি লাগবে।’
অন্যদিকে ফার্মগেটের ছন্দ-আনন্দ হলে চলছে ‘বস-২’ ও ‘মাথা খারাপ’ নামের দুটি পুরনো ছবি।
প্রথমটি যৌথ প্রযোজনার এবং পরেরটির অশ্লীল পোস্টারে ছেয়ে আছে হলের দেয়াল।
প্রেক্ষাগৃহটিতে গিয়ে দেখা গেলো বেশ অলস সময় পার করছেন এর কর্মচারীরা। হলের পুরনো কর্মচারী মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রতিদিন ৩টি করে ছবির শো হচ্ছে। লোকজন খুব কম। মাসের শেষ হওয়াতে আরও কম আসছেন দর্শক। তার ভাষ্য, ‘এফডিসিওয়ালারা তো এখন ছবি করে না। লোকজন এ জন্য আর আসেও না।’
প্রেক্ষাগৃহগুলোর তিনতলায় পাওয়া গেলো এর ব্যবস্থাপক মো. শামসুদ্দিনকে।
তিনি গত এক সপ্তাহের কিছু পরিসংখ্যান বাংলা ট্রিবিউনের সামনে তুলে ধরলেন। বললেন, ‘আনন্দ সিনেমা হলে প্রতিদিন খরচ ১৫৭৭৬ টাকা। ছন্দ হলে এটা ৯৫৫০। আপনারা শুনলে অবাক হবেন, করোনার পর সিনেমা হল খুলে প্রথম সপ্তাহে। আনন্দে আমাদের টিকিট বিক্রি হয়েছে ১৮৬৭৭ টাকার। বিভিন্ন ট্যাক্স দিয়ে আমরা পেয়েছি এর অর্ধেক ৯৩৩০ টাকার মতো। ছন্দে পেয়েছি ৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। তাহলে এখন হিসাব করে দেখুন, আয়ের এই এক সপ্তাহের টাকা আমাদের একদিনের ব্যয়ের সমানও না। তার মানে সপ্তাহের বাকি ৬ দিনের খরচ হলো আমাদের লোকসান। তাই ভালো ছবি খুব দরকার। এটা শুধু হল মালিক নয়, সিনেমার সঙ্গে যুক্ত সব পেশার মানুষের জন্যই দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত মাসে আমাদের বিদ্যুৎ বিলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এসেছিল। কারেন্টের বিল এসেছে পাঁচ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা। পানির দেড় লাখ টাকা। পরে অনেক অনুরোধ করে কিস্তি আকারে শোধ করার ব্যবস্থা করেছি। কারণ, এর লাইন একবার কাটা হলে আমাদের সামর্থ্য নেই পুনরায় হল চালু করার।’
তিনি জানান, ৩৫ জন স্টাফ নিয়ে বেশ বিপদে আছে হল কর্তৃপক্ষ। কারণ প্রায় ২৪ লাখ টাকা বকেয়া জমা হয়ে গেছে এই করোনাকালে।
রাজধানীকেন্দ্রিক সিনেমা হল সংশ্লিষ্ট নেতা, কর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দেশের প্রায় প্রতিটি সিনেমা হলের একই অবস্থা। তাই শুধু হল সংস্কার নয়, কর্মচারীদের কল্যাণ বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে শিগগিরই দুইশ হল থেকে ৫০-এ নেমে আসবে। একটা সময় দেখা যাবে, সিনেমা মুক্তির জন্য হল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
পাশাপাশি মুক্তির মিছিলে পড়ে থাকা ছবিগুলো দ্রুত মুক্তি দিতে হবে। নইলে এগুলো মুক্তির জন্য হল খুঁজে পাওয়া যাবে না, এমন শঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছবি: প্রতিবেদক