‘যুবরাজ’-এর পদকপ্রাপ্তি এবং কিছু আক্ষেপ

অবশেষে একুশে পদক পাচ্ছেন নন্দিত অভিনেতা খালেদ খান, যদিও সেই প্রাপ্তি মৃত্যুরও অনেক পরে। এই অভিনেতা সমধিক পরিচিত ছিলেন ‘যুবরাজ’ নামে। যতদিন তিনি অভিনয় করেছেন, ততদিন যুবরাজের মতোই অভিনয় করেছেন।

মৃত্যুর আট বছর পর তার এই পদকপ্রাপ্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন- এতদিন পরে কেন? যদিও যুবরাজের একমাত্র সন্তান ফারহিন খান জয়িতা বলেন ভিন্ন কথা। তার মতে, ‘যথার্থ সময়ে পদক দেওয়া হয়েছে বাবাকে। বাবার সিনিয়র যারা সু-অভিনেতা, তারা নিশ্চয় বাবার আগে পাবেন। উনি একটু আগে আমাদের ছেড়ে গেছেন বলে হয়তো এভাবে ভাবছেন অনেকে, ভাবছেন তারা, যারা তাকে, তার কাজকে ভালোবাসেন।’

২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর খালেদ খান মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের অন্যতম এই অভিনেতা ১৯৫৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানাধীন মসদই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সদস্য হয়ে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ নাটকে অভিনয় করার মাধ্যমে ঢাকাতে তার অভিনয় জগতে প্রবেশ। প্রথিতযশা এই অভিনেতা ৩০টির অধিক মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি ১০টি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন।

যুবরাজের ভাই শাহীন খান বলেন, ‘অভিনয়ে অবদানের জন্যে ২০২২ সালের একুশে পদকে ভূষিত হয় খালেদ খান! চলে যাওয়ার আট বছর পরে হলেও তার এই প্রাপ্তিতে আমরা আনন্দিত, গর্বিত! এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সকলের প্রতি আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।’

যুক্ত করেন, ‘‘আরোগ্যের সম্ভাবনাহীন এক কঠিন অসুখে আক্রান্ত হয়ে তিনি অভিনয়ের শারীরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন মধ্য চল্লিশেই৷ কিন্তু নির্দেশনার কাজটি চালিয়ে যেতে পারতেন শেষ দিন পর্যন্ত। এই অসুস্থতা নিয়েও তিনি ‘রূপবতী’র মতো নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য, আমরা তার জন্যে কোনও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। যে মানুষটি মৃত্যুর দুদিন আগেও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-এ পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যেতে পারলেন নিষ্ঠার সাথে। অথচ যে জায়গাটিতে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সক্ষম ও সফল, সেখানে থেকে গেলেন কর্মহীন। এটি তার জন্যে যেমন বেদনার ছিল, আমাদের জন্যেও অনেক লজ্জার। একটু সংবেদনশীলতা দিয়ে তার জন্যে কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারলে তিনি তার প্রিয় জায়গাটিতে কর্মক্ষম থাকতে পারতেন শেষ দিন পর্যন্ত। তাতে তিনি যেমন তৃপ্তিবোধ করতেন, আমাদের থিয়েটার ও থিয়েটারের নতুন প্রজন্মও সমৃদ্ধ হতে পারতো, এতে কোনও সন্দেহ নেই। আমরা থিয়েটারের মানুষেরা যদি এটুকু সংবেদনশীলতা দেখাতে না পারি তাহলে সমাজের আর কোন অংশ থেকে কী আশা করতে পারি?’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের মেধাবী ছাত্র খালেদ খান ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরির পাশাপাশি অভিনয়কেও প্রাধান্য দিয়েছেন। মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি তিনি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের দেওয়ান গাজীর কিসসা, কোপিনিকের ক্যাপ্টেন, শাজাহান, বাকি ইতিহাস, নূরলদীনের সারাজীবন, অচলায়তন, দর্পণ, গ্যালিলিও, ঈর্ষা ও রক্তকরবীসহ ৩০টির অধিক নাটকে অভিনয় করেছেন। অচলায়তন, ঈর্ষা, গ্যালিলিও ও রক্তকরবী নাটকে তার অনবদ্য অভিনয় এ দেশের দর্শক চিরদিন মনে রাখবে।

খালেদ খান নির্দেশিত উল্লেখযোগ্য মঞ্চ নাটকের মধ্যে রয়েছে, মুক্তধারা, ক্ষুধিত পাষাণ, পুতুল খেলা, কালসন্ধ্যা, স্বপ্নবাজ, রূপবতী ও কারিগর।

খালেদ খানের টিভি নাটকে অভিষেক হয় ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘সিঁড়িঘর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি অসংখ্য টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত অনেক একক ও ধারাবাহিক নাটক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। টিভি নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সকাল সন্ধ্যা, এইসব দিন রাত্রি, ফেরা, রূপনগর, মফস্বল সংবাদ, মোহর আলী, দমন, লোহার চুড়ি, দক্ষিণের ঘর, কোন কাননের ফুল, শীতের পাখি, ওথেলো এবং ওথেলো ইত্যাদি।

খালেদ খান মঞ্চ ও টিভি নাটক ছাড়াও ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ এবং ‘আহা’ নামে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন।

অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে মোহাম্মাদ জাকারিয়া পদক, নুরুন্নাহার স্মৃতি পদক, সিজেএফবি সেরা পরিচালক, ইমপ্রেস-অন্যদিন সেরা অভিনেতার পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক পেয়েছেন।

প্রসঙ্গত, চলতি বছর একুশে পদক পাচ্ছেন ২৪ বিশিষ্ট নাগরিক। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দিচ্ছে সরকার। ৩ ফেব্রুয়ারি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

এতে ‘শিল্পকলা’য় পদক পাচ্ছেন ৭ শিল্পী। তারা হলেন, জিনাত বরকতউল্লাহ (নৃত্য), নজরুল ইসলাম বাবু (মরণোত্তর-সংগীত), ইকবাল আহমেদ (সংগীত), মাহমুদুর রহমান বেণু (সংগীত), খালেদ খান (মরণোত্তর-অভিনয়), আফজাল হোসেন (অভিনয়) ও মাসুম আজিজ (অভিনয়)।