কান উৎসবের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হলেন ইরিস নোব্লোক। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পদে এবারই প্রথম কোনও নারীকে দেখা যাবে। আগামী ১ জুলাই তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
গত ২৩ মার্চ কান উৎসবের আয়োজক ফ্রেঞ্চ অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ইরিস নোব্লোক সভাপতি নির্বাচিত হন। পর্ষদে আছেন ফ্রান্সের সরকারি কর্মকর্তা ও চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ম অনুযায়ী, গোপন ব্যালটের মাধ্যমে কান উৎসবের সভাপতি নির্বাচন করা হয়। তিন বছর মেয়াদে এই পদভার নেবেন ইরিস নোব্লোক। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কানের সভাপতি পদে থাকবেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করবেন উৎসবটির জেনারেল ডেলিগেট থিয়েরি ফ্রেমোঁ ও মহাসচিব ফ্রাসোয়াঁ দেরুসু।
থিয়েরি ফ্রেমোঁ বলেন, ‘ইরিস নোব্লোকের যোগদানের অপেক্ষায় আছি আমরা। তাকে সভাপতি পদে নির্বাচনের ফলে কান উৎসবের সংকল্প যতটা সম্ভব শক্তিশালী করে রাখাটা সহায়ক হবে।’
কান উৎসবের বর্তমান সভাপতি পিয়েরে লেসকিউর আগামী ৩০ জুন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। তার কথায় বলেন, ‘কানের সভাপতি পদে একজন নারী আসছেন, এজন্য আমি রোমাঞ্চিত। ইরিস নোব্লোকের হাতে আনন্দের সঙ্গে আগামীর মশাল তুলে দেবো। নতুন দায়িত্বে নিঃসন্দেহে দূরদর্শিতা ও প্রতিভার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হবেন তিনি।’
কান উৎসবের পরিচালনা পর্ষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ইরিস নোব্লোক বলেন, ‘ফ্রান্স আমাকে কান উৎসবের সভাপতি নির্বাচন করায় সম্মানিত বোধ করছি। বৈশ্বিক এই আয়োজনের সুবাদে চলচ্চিত্রে এখনও প্রাণ পাওয়া যায়। প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রকে ধরে রাখার শৈল্পিক পথ দেখিয়ে আসছে কান উৎসব। পরিচালনা পর্ষদ, জেনারেল ডেলিগেট থিয়েরি ফ্রেমোঁ এবং চলচ্চিত্র শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করতে মুখিয়ে আছি। পিয়েরে লেসকিউরকে ধন্যবাদ জানাই, গত আট বছর উৎসবটির জন্য চমৎকার ভূমিকা রেখেছেন তিনি।’
ইরিস নোব্লোক আইন বিষয়ে পড়েছেন জার্মানির মিউনিখে লুডউইগ ম্যাক্সিমিলিয়ান্স ইউনিভার্সিটি এবং নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে। তিনি ২৫ বছর ওয়ার্নার মিডিয়ার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরমধ্যে ১৫ বছর সামলেছেন ওয়ার্নার ব্রাদার্স ফ্রান্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদ। ২০২০ সালে ওয়ার্নার মিডিয়া ফ্রান্স, বেনেলাক্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের সিইও হন।
ওয়ার্নার ফ্রান্সের সিইও থাকাকালে কান উৎসবে দারুণ কিছু ছবি এবং বিখ্যাত নির্মাতাদের নিয়ে এসেছিলেন ইরিস নোব্লোক। এরমধ্যে রয়েছে ক্লিন্ট ইস্টউডের ‘আনফরগিভেন’ ছবির ২৫ বছর পূর্তি, স্ট্যানলি কুবরিকের ‘২০০১: অ্যা স্পেস অডিসি’র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করা ক্রিস্টোফার নোলান, স্টিভেন সোডারবার্গের ‘চে’, উডি অ্যালেনের ‘ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোনা’ ও ‘ইউ উইল মিট অ্যা টল ডার্ক স্ট্রেঞ্জার’, দামিয়ান সিফ্রনের ‘ওয়াইল্ড টেলস’, বাজ লারম্যানের ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’, জর্জ মিলারের ‘ম্যাড ম্যাক্স: ফিউরি রোড’, মিশেল হাজানাভিসিয়ুসের ‘দ্য আর্টিস্ট’।
২০০৮ সালে ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা নাইট অব দ্য লিজিয়ন অব অনারে ভূষিত হন তিনি। চলচ্চিত্র শিল্পের উৎকর্ষে ২০২১ সালের জুলাইয়ে গড়ে ওঠা আইটুপিও’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি।
কান উৎসবের সিনেফ্যঁদাসোর অংশ লাতেলিয়ারের ১৮তম আসরে বিভিন্ন দেশের ১৫ জন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তাদের সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্র প্রকল্পকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরমধ্যে নবীন পরিচালকের পাশাপাশি আছেন প্রখ্যাত নির্মাতা। এগুলোতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ তৈরির জন্য আগামী ২২ মে থেকে ২৭ মে ফিল্ম প্রফেশনালদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাবেন নির্মাতারা। এর মাধ্যমে অংশীদার খুঁজে পাওয়া এবং শুটিংয়ের জন্য তহবিল চূড়ান্ত করার সুযোগ থাকবে।
নির্বাচিত প্রকল্পগুলো হলো ‘আনা ইস্ট’ (নেদারল্যান্ডস), ‘দ্য হায়েনাস সং’ (জিম্বাবুয়ে), ‘কটন কুইন’ (সুদান), ‘গুরিয়া’, (জর্জিয়া), ‘হ্যামলেট ফ্রম দ্য স্লামস’ (মিসর), ‘মেড ইন ইইউ’ (বুলগেরিয়া), ‘ফিলাক্স’ (তুরস্ক), ‘স্যাম’ (ফিলিপাইন), ‘দ্য বিয়ার গার্ল ইন ইয়াঙ্গুন’ (মিয়ানমার), ‘দ্য ব্লাইন্ড ফেরিম্যান’ (ইরাক/সুইজারল্যান্ড), ‘দ্য ডাউট’ (ফিলিস্তিন/ইসরায়েল), ‘দ্য ফরেস্ট’ (চেক রিপাবলিক), ‘দ্য লাস্ট টিয়ারস অব দ্য ডিসিসড’ (ইথিওপিয়া), ‘হোয়্যার দ্য রিভার বিগিন্স’ (কলম্বিয়া) এবং ‘ইউ আর মাই এভরিথিং’ (ইসরায়েল)।
সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্দীপনা জোগাতে এবং নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে ২০০৫ সালে কান উৎসবে চালু হয় ‘লাতেলিয়ার’ কার্যক্রম। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এতে নির্বাচিত ২৩১টি প্রকল্পের মধ্যে ১৮২টির কাজ শেষ হয়েছে এবং ১৯টির শুটিং শুরুর অবস্থায় রয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আগামী ১৪ এপ্রিল বিকালে সংবাদ সম্মেলনে কান উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশন এবং বিচারকদের তালিকা ঘোষণা করা হবে।
এবার স্বাভাবিকভাবে মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে কান উৎসবের ৭৫তম আসর। আগামী ১৭ মে শুরু হয়ে এই আয়োজন চলবে ২৮ মে পর্যন্ত। এবারের ‘মিস্ট্রেস অব সিরিমনিস’ বেলজিয়ান অভিনেত্রী ভার্জিনি এফিরা। উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করবেন তিনি।