প্রথম ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অস্কারের সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়েছে অ্যাপল টিভি প্লাস। একটি বধির পরিবারের একমাত্র শ্রবণশক্তি সম্পন্ন কিশোরীর গায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সাজানো ‘কোডা’ ছবির সুবাদে এসেছে এই সম্মান। নেটফ্লিক্সের ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবি ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’কে হটিয়ে অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র হয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে আন্ডারডগ ‘কোডা’।
কিন্তু উইল স্মিথ কাণ্ডে যেন কিছুটা চাপা পড়ে গেছে অ্যাপল টিভি প্লাসের ঐতিহাসিক অর্জন। সেরা অভিনেতা শাখায় পুরস্কার জয়ের কিছুক্ষণ আগে কমেডিয়ান ক্রিস রককে মঞ্চে উঠে চড় মেরে তামাম দুনিয়ায় তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন উইল স্মিথ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এই চড়কে ঘিরে বইছে ভীষণ ঝড়!
তবুও ‘কোডা’কে তো আর বাদ দেওয়া যাচ্ছে না! ৯৪তম অস্কারে তিনটি শাখায় মনোনয়ন পেয়ে তিনটিতেই জিতেছে ছবিটি। সবশেষ সেই ১৯৩২ সালে চারটির কম মনোনয়ন পাওয়া কোনও ছবি হিসেবে ‘গ্র্যান্ড হোটেল’ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্র শাখায় পুরস্কার জিতেছিল। এক্ষেত্রেও ইতিহাসের পাতা নতুনভাবে লেখালো ‘কোডা’।
‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’-এর মতো এটিও পরিচালনা করেছেন একজন নারী। তিনি হলেন শন হেডার। সেরা অ্যাডাপ্টেড চিত্রনাট্য পুরস্কার জিতেছেন তিনি। তার ছবির গল্পে দেখা যায়, বধির সদস্য বেশি এমন একটি পরিবার ছোট পরিসরে মৎস্য ব্যবসা করে। তারা পরিবারের একমাত্র শ্রবণশক্তি সম্পন্ন কিশোরী রুবির সহায়তা নেয়। কিন্তু মেয়েটির স্বপ্ন গায়িকা হওয়া।
‘কোডা’ শব্দের পূর্ণ রূপ হলো চিলড্রেন অব ডিফ অ্যাডাল্টস (বধির মা-বাবার সন্তান)। স্বল্প বাজেটে নির্মিত হলেও অস্কারপ্রাপ্তির ফলে মুক্ত চলচ্চিত্রের জয় হলো। বধির পরিবারের গল্প বলায় এটি প্রশংসিত হয়েছে। এর বেশিরভাগ অভিনয়শিল্পী বাস্তবেও বধির। বধির-প্রধান অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে নির্মিত কোনও ছবি এবারই প্রথম অস্কারের সেরা চলচ্চিত্র শাখায় জিতলো। তাদের মধ্যে অন্যতম মার্লি ম্যাটলিন। ৩৫ বছর আগে অস্কারে প্রথম বধির অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলেন ট্রয় কটসার। তিনি প্রথম বধির অভিনেতা হিসেবে সেরা পার্শ্ব অভিনেতা শাখায় অস্কার জিতলেন। ‘কোডা’ ছবিতে তারা অভিনয় করেছেন বধির দম্পতির ভূমিকায়। তাদের শ্রবণশক্তি সম্পন্ন ১৭ বছরের কিশোরীর ভূমিকায় দেখা গেছে এমিলিয়া জোন্সকে। তিনি গায়ক-টিভি উপস্থাপক অ্যালেড জোন্সের মেয়ে।
সেরা চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণার আগে ‘অ্যান্ড দ্য অস্কার গোজ টু...’ বলেছেন লিজা মিনেলি ও লেডি গাগা। ১৯৭২ সালে ‘ক্যাবারে’ ছবির মাধ্যমে সেরা অভিনেত্রী শাখায় অস্কার জেতেন লিজা। তিনি মঞ্চে এসেছেন হুইলচেয়ারে বসে। ২০১৯ সালে ‘অ্যা স্টার ইজ বর্ন’ ছবির গানের সুবাদে অস্কার পান গাগা।
কীভাবে সেরা চলচ্চিত্র হলো ‘কোডা’? সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচন হয়ে থাকে ব্যালটের ক্রমিক অনুযায়ী। এবারের আসরে মনোনীত ১০টি ছবির মধ্যে অস্কারের ভোটাররা যেটি সবার ওপরে বেশি রেখেছেন সেটাই পুরস্কার পাওয়ার কথা। স্বাভাবিকভাবে ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’ দৌড়ে এগিয়ে ছিল। কিন্তু ছবিটি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। কারণ অনেকের কাছে এটি খুব ধীর এবং নিস্তেজ মনে হয়েছে। তারা ছবিটিকে ৯ কিংবা ১০ নম্বরে রেখেছেন। ফলে দর্শকপ্রিয় ‘কোডা’ ওপরের দিকে চলে আসে। ব্যালটে এক নম্বরে খুব বেশি ভোটারের ভোট না পেলেও দুই থেকে চারের মধ্যে বেশিরভাগ ভোটার রেখেছে। শেষমেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারটি ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে হৃদয়ছোঁয়া ছবিটি।
৯৪তম অস্কারে সর্বাধিক ১২টি মনোনয়ন পাওয়ায় ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ’ সেরা চলচ্চিত্র শাখায় জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েছিল। নেটফ্লিক্স স্বপ্ন দেখছিল, এবার বোধহয় সম্মানজনক পুরস্কারটি ধরা দেবে। কিন্তু সেরা পরিচালক (জেন ক্যাম্পিয়ন) ছাড়া আর একটি বিভাগেও ট্রফি মেলেনি। অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ইতিহাসে তৃতীয় নারী হিসেবে সেরা পরিচালক পুরস্কার পেলেন ৬৭ বছর বয়সী এই কিউই নির্মাতা। এ নিয়ে টানা দু’বার অস্কারের সেরা পরিচালক স্বীকৃতি গেলো নারীদের হাতে। গত বছর ‘নোম্যাডল্যান্ড’ ছবির জন্য এই পুরস্কার পান চীনের ক্লোয়ি জাও। অস্কারে ক্যাথরিন বিগেলো ২০১৩ সালে ‘দ্য হার্ট লকার’ ছবির মাধ্যমে অস্কারে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারী।
এবারের আসরে সর্বাধিক ছয়টি শাখায় পুরস্কার জিতেছে ‘ডুন’। তবে সেগুলো সবই কারিগরি শাখার। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত আমেরিকান সাহিত্যিক ফ্রাঙ্ক হারবার্টের ‘ডুন’ উপন্যাস অবলম্বনে কল্পবিজ্ঞানধর্মী ছবিটি পরিচালনা করেছেন কানাডার ডেনি ভিলন্যুভ।
‘দ্য আইস অব টেমি ফেই’ ছবির জন্য সেরা অভিনেত্রী শাখায় পুরস্কার জিতেছেন আমেরিকান তারকা জেসিকা চ্যাস্টেইন। খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচারণা করা টিভি ব্যক্তিত্ব ট্যামি ফেই বাকারের চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে এই সম্মান উঠলো তার হাতে।
স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’ ছবিতে আনিতা চরিত্রের সুবাদে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী শাখার পুরস্কার পেয়েছেন আরিয়ানা ডিবোস। ৬০ বছর আগে একই চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে অস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী হন রিটা মোরেনো। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে হলিউড অ্যান্ড হাইল্যান্ড সেন্টারের ডলবি থিয়েটারে ২৭ মার্চ রাতে (বাংলাদেশ সময় ২৮ মার্চ সকাল ৭টা) অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে হাজির ছিলেন রিটা মোরেনো। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, নিজেকে প্রকাশ্যে সমকামী পরিচয় দেওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জয়ের রেকর্ড গড়েছেন আরিয়ানা ডিবোস।
ব্রিটিশ অভিনেতা-নির্মাতা স্যার কেনেথ ব্রানা ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সাতটি ভিন্ন শাখায় মনোনীত হলেও এর আগে পুরস্কার পাননি তিনি। এবারের আসরে সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য শাখায় অস্কার জিতেছেন তার শৈশবের স্মৃতি অবলম্বনে নির্মিত সাদাকালো ছবি ‘বেলফাস্ট’। উত্তর আয়ারল্যান্ডে জাতীয়তাবাদকে ঘিরে তিন দশকের সংঘাত শুরুর পটভূমিতে একটি পরিবারের এক বালকের গল্প রয়েছে এতে।
আমেরিকান নির্মাতা জ্যাক স্নাইডার ভালোই দান মেরেছেন! নতুন দুই দর্শকপ্রিয় শাখা অস্কারস ফ্যান ফেভারিট জিতেছে তার পরিচালিত ‘আর্মি অব দ্য ডেড’। অপরদিকে অস্কারস চিয়ার মোমেন্ট পেয়েছে “জ্যাক স্নাইডার’স জাস্টিস লিগ”।
পুরস্কার বিতরণ শুরুর আগে লালগালিচায় কিছু তারকা ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ‘উইথ রিফিউজিস’ হ্যাশট্যাগ লেখা নীল রঙা ফিতা বহন করেছেন। এ প্রচারণায় সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। মূল অনুষ্ঠানে ইউক্রেনের প্রতি সম্মান জানাতে নীরবতা পালন করেছে আয়োজকরা।
তিন বছর সঞ্চালক বিহীন থাকার পর মঞ্চে এবারের আয়োজন সঞ্চালনা করেন আমেরিকান তিন অভিনেত্রী ওয়ান্ডা সাইকস, রেজিনা হল এবং অ্যামি শুমার। এবারই প্রথম তিন নারীকে সঞ্চালক হিসেবে দেখা গেলো। এ প্রসঙ্গে রসিকতা করে অ্যামি শুমার শুরুতেই বলেন, ‘এ বছর তিন জন নারীকে নেওয়া হয়েছে, কারণ একজন পুরুষকে নেওয়া এর চেয়ে বেশি খরচ হতো!’
হাসিখুশি আবহে ভালোই হচ্ছিল এবারের অনুষ্ঠান। পুরস্কার বিতরণ, গান-বাজনা, হাস্যরসসহ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন সবাই। কিন্তু হঠাৎ বাগড়া দিলেন উইল স্মিথ!
সেরা প্রামাণ্যচিত্র শাখার পুরস্কার বিতরণ করতে মঞ্চে এসেছিলেন ক্রিস রক। বিজয়ী ছবির নাম ঘোষণার আগে উইল স্মিথের স্ত্রী জাডা পিঙ্কেট স্মিথের চুল পড়া নিয়ে ঠাট্টার ছলে ৫৭ বছর বয়সী এই আমেরিকান তারকা বলেন, ‘‘জাডা আই লাভ ইউ। ‘জি. আই. জেন টু’ ছবি দেখতে মুখিয়ে আছি।’’
১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রিডলি স্কটের ‘জি. আই. জেন’ ছবিতে নৌবাহিনীর মতো বিশেষ অপারেশন প্রশিক্ষণ নেওয়া একটি চরিত্রে অভিনয় করেন ডেমি মুর। ছবিটির জন্য মাথার চুল ছেঁটে ফেলেছিলেন তিনি। জাডা পিঙ্কেট স্মিথের চুল পড়া সমস্যার কারণে তার অবয়ব অনেকটা ‘জি. আই. জেন’ ছবির ডেমি মুরের মতো হয়ে গেছে বলা যায়। ক্রিস রক সেজন্যই এই রসিকতা করেছেন। তখন উইল স্মিথও হেসেছেন। কিন্তু জাডা পিঙ্কেট স্মিথের নেতিবাচক অভিব্যক্তি দেখার পর উইল স্মিথ আসন থেকে উঠে মঞ্চে গিয়ে ক্রিস রককে আচমকা চড় মেরে বসেন। এরপর আসনে ফিরে ৫৩ বছর বয়সী এই তারকা উঁচু গলায় বলেন, ‘তোমার বাজে মুখে আমার স্ত্রীর নাম নেবে না।’
উইল স্মিথ রেগে যাওয়ায় তাকে ক্রিস রক বলেন, ‘‘বন্ধু, এটা ‘জি. আই. জেন’ কৌতুক ছিল।’’ তখন উইল স্মিথ আবারও জোরগলায় বলেন, ‘তোমার বাজে মুখে আমার স্ত্রীর নাম নেবে না।’ এরপর ক্রিস রক বলেন, ‘ঠিক আছে নেবো না। এটা টেলিভিশন ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় রাত।’
ততক্ষণে চড়ের ঘটনা ডলবি থিয়েটারে উপস্থিত এবং টিভি সেটের সামনে বসা কোটি কোটি দর্শককে হতভম্ব করে দিয়েছে। সেই বিমর্ষ প্রভাব অনুষ্ঠানের বাকি অংশ জুড়ে ছায়া ফেলেছে।
অস্কার আয়োজকদের কল্পনাতেও এমন কিছু ছিল না। তারা দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কত চেষ্টাই না করেছেন। কিন্তু অনুষ্ঠানটি আলোচিত হয়ে উঠলো কিনা নেতিবাচক কারণে! অস্কারের মূল আলোচনার বিষয় হওয়ার কথা যেখানে ‘কোডা’, উইল স্মিথ হুট করে সব মনোযোগ কেড়ে নিলেন!
ক্রিস রককে চড় মারার কিছুক্ষণ পর ‘কিং রিচার্ড’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতা শাখার পুরস্কার নিতে আবারও মঞ্চে গিয়ে আয়োজক এবং মনোনীত সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। নিজের অনুভূতি জানিয়ে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন উইল স্মিথ। তার চোখ বেয়ে জল পড়তে দেখেছে সবাই।
অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ৯৪তম আসরে সেরা অভিনেতা শাখায় উইল স্মিথের জয় একরকম অবধারিত ছিল। ‘কিং রিচার্ড’ ছবির সুবাদে ৫৩ বছর বয়সী এই তারকা এর আগে বাফটা, গোল্ডেন গ্লোবস, ক্রিটিকস চয়েস মুভি অ্যাওয়ার্ডস এবং স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডস জিতেছেন। ভেনাস ও সেরেনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো তৈরি করতে রিচার্ড উইলিয়ামসের দৃঢ়সঙ্কল্প তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে।