জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস

বিধ্বস্ত এফডিসির সুরম্য সম্ভাবনা মাথা তুলবে কবে

সময়ের হাত ধরে বদলেছে সিনেমার নির্মাণশৈলী। এসেছে নানা প্রযুক্তি। সেসবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে আছে সিনেমার প্রাণকেন্দ্র ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন’ বা বিএফডিসি। যেখানে এখন আর সিনেমার শুটিং হয় না বললেই চলে, ফ্লোরগুলো হয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। তবে সরব রয়েছে সংগঠনগুলোর রাজনীতি; যার বেশিরভাগই কাদাজলে কদাকার।

তবে এসব ছাপিয়ে এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে (৩ এপ্রিল) পুনরায় কোমর বেঁধে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের কণ্ঠে। এরমধ্যে শুরু হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। কিন্তু সে প্রকল্পের গতির কাছে যেন কচ্ছপও গতিদানব!

২০১৮ সালে এফডিসিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য দুটি শুটিং ফ্লোর ভেঙে উঁচু ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৫ তলাবিশিষ্ট সে ভবনে থাকবে সিনেমার স্টুডিও, শুটিং ফ্লোর, সিনেমা হল, আবাসিক হোটেল, সুইমিংপুলসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। ‘বিএফডিসি কমপ্লেক্স’ নামের এ প্রকল্পের জন্য ৩২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা অনুমোদন দেয় একনেক।
 
একমাত্র সুরম্য স্থাপনা মসজিদপরিকল্পনা ছিল, ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই ১৫ তলা ভবনের কাজ শেষ হবে। কিন্তু সেই মেয়াদ গত হয়েছে প্রায় দেড় বছর। নির্মাণ শেষ তো দূরের কথা, মোটে বেজমেন্ট পেরিয়ে মাথা তুলেছে ভবনটি।

রবিবার (২ এপ্রিল) সরেজমিন দেখা যায়, কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকায় সেখানে গিয়ে নির্মাণ সংক্রান্ত কোনও কর্মীর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে চলচ্চিত্র দিবসের সাজসজ্জায় নিয়োজিত থাকার সুবাদে এফডিসির চিফ অব ফ্লোর অ্যান্ড সেট ও জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রি বড়ুয়ার নাগাল পাওয়া গেলো। 

কাজী নজরুল ভাস্কর্য পড়ে আছে অবহেলায়ধীরস্থির কাজের প্রসঙ্গ নয়, তিনি শোনালেন আশার বাণী। তার ভাষ্য, ‘২০২৬ সাল নাগাদ শেষ হবে আমাদের এফডিসি কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ। এটা হলে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো। প্রধানমন্ত্রী খুব চলচ্চিত্রবান্ধব মানুষ। তিনি সার্বিক সহযোগিতা করছেন। অনুদানও বাড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মানসম্পন্ন ছবি তো নির্মাণ করতে হবে। ছবি মানসম্পন্ন হলে ব্যবসা হবে, হলও বাঁচবে।’

এটুকু অস্বীকারের সুযোগ নেই, করোনা মহামারির বড় ধাক্কা লেগেছে কমপ্লেক্স নির্মাণে। ফলে কাজ পিছিয়েছে দফায় দফায়। তবে মহামারির স্থবিরতা পেরিয়ে বহু দিন হয়ে গেলেও কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলেই মনে করছেন সিনেমা সংশ্লিষ্টরা। 

সমিতিগুলোতে অলস আড্ডাএদিকে নির্মাণযজ্ঞের কারণে বিধ্বস্ত এফডিসিকে চেনা দায়। এরমধ্যে বন্ধ হয়েছে এফডিসির প্রধান ফটক। ধুলোবালিময় আঙিনায় যে তারকাদের পায়ের ছাপ পড়ে না, তা বুঝতে দুরবিনে চোখ রাখতে হয় না। এখন এফডিসির যত রঙ-রূপ-চর্চা সব সমিতি কেন্দ্রিক। ফলে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি ও প্রযোজক সমিতির সামনেই থাকে গুটিকয়েক শিল্পী-কুশলীর আনাগোনা। যদিও সে আনাগোনা থেকে নতুন কাজের ভাবনা নয় বরং একে-অন্যের বিষোদগারের গল্প ভেসে আসে হরহামেশা। গণমাধ্যম হোক বা নামি-বেনামি ইউটিউব চ্যানেল, মাইক্রোফোন-বুম সামনে পেলেই বজ্রকণ্ঠের দরজা খুলে দেন জুনিয়র শিল্পী থেকে অবসরের দিন গোনা জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরাও!
 
এফডিসি যেন বিরানভূমিএমন মর মর অবস্থার মধ্যেও এফডিসির আয়-রোজগারের ইতিবাচক অবস্থার খবর দিলেন হিমাদ্রি বড়ুয়া। তার দাবি, ‘আমাদের এখানে প্রচুর কাজ হচ্ছে। প্রতিটা ফ্লোরেই বুকিং থাকে। মাসে প্রায় ৪০-৪৫ লাখ টাকা আয় করি। বিষয়টা হলো, একটা সময় আমরা মনোপলি (একচেটিয়া) ব্যবসা করতাম। যখন থার্টিফাইভের সময় ছিল, আমরা ফিল্ম বিক্রি করতাম, ল্যাব থেকে আয় আসতো। এখন ডিজিটাল হওয়াতে অনেকেই মেশিনারিজ নিয়ে এসেছে। তবে সার্বিক হিসাব করলে আমরাই এখনও ভালো অবস্থানে আছি।’

চলচ্চিত্র দিবসে এফডিসির ফটক সেজেছে এভাবেএফডিসির রঙিন দেয়ালে যেমন বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে, তেমনি সিনেমা নির্মাণের জমজমাট রূপও এখন অতীতের ভাগাড়ে। দিনপঞ্জিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বছর বাড়লেও সমান্তরালে কমছে সিনেমার সংখ্যা। সম্ভাবনার সূর্য অস্তপারে ছুটলেও নতুন কোনও ভোরে তা তেজোদ্দীপ্ত হয়ে জ্বলে উঠবে, এমন প্রত্যাশা বুকছাড়া করতে চান না সিনেমাপ্রেমীরা।হিমাদ্রি বড়ুয়া