বলা হয় সংগীতাঙ্গনে হাসান আবিদুর রেজা জুয়েলের জন্মদাতা আইয়ুব বাচ্চু। প্রতিটি শিল্পীরই শুরুটা সাধারণত অনেকের হাত ধরে হয়। কিন্তু জুয়েলের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে একেবারে এককভাবে, আইয়ুব বাচ্চুর হাত ধরে।
জুয়েলের শুরুর দিকে তার ভক্তরা নিশ্চিত ছিলেন, আইয়ুব বাচ্চুর আপন ছোট ভাই হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল! যদিও এর সঙ্গে বাস্তবতা ছিল না। তবে দুজনের আমৃত্যু সম্পর্কটা ছিল গুরু-শিষ্য তথা বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের মতোই। দুজনেই এখন প্রয়াত। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর অকাল প্রস্থানে যান আইয়ুব বাচ্চু। গুরুর পথ ধরে জুয়েলের যাওয়াটাও বড় অসময়ে (৩০ জুলাই ২০২৪)।
বেশ আগে বাংলাভিশনের ‘আমার আমি’ অনুষ্ঠানে গুরু-শিষ্য অতিথি হয়েছিলেন। কথা বলেছেন নিজেদের প্রথম দেখার স্মৃতি ধরে।
সেখানে জুয়েল বলেন, ‘‘আমি বরিশাল থাকতাম। কখনও ভাবিনি গান রেকর্ড হবে, অ্যালবাম বের হবে। ১৯৮৬ সালে যখন ঢাকায় থাকতে শুরু করি, আমার বন্ধু আবৃত্তিকার শিমুল মোস্তফা প্রথম বলে, ‘তোর একটা অ্যালবাম বের করা উচিত’। আমি বললাম, আমাকে আর কে ডাকবে! তখন ও বললো, একজন ভদ্রলোক আছেন, আজিজুর রহমান কচি, তার কাছে তোকে নিয়ে যাবো। উনি তোর গান শুনলেই রাজি হবেন।’’
সেই স্মৃতি টেনে জুয়েল বলেন, ‘তখন স্বপ্ন দেখতাম, যদি কোনোদিন আমার অ্যালবাম হয়, তাহলে এক ভদ্রলোকের কাছে যাবো, সেটা আইয়ুব বাচ্চু। ঢাকায় যখন শিমুল অ্যালবামের কথা বললো, তখন বললাম অ্যালবাম করলে একজনের কাছেই যেতে হবে, সেটা আইয়ুব বাচ্চু।’
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ঠিকই এক বন্ধুর সহযোগিতায় আইয়ুব বাচ্চুর বাসায় হাজির হলেন জুয়েল। সেদিনের স্মৃতি থেকে জুয়েল বলেন, ‘বাচ্চু ভাই সেদিন একটা গিটার আমার হাতে তুলে বললেন, গাও।’
পাশ থেকে আইয়ুব বাচ্চু মনে করিয়ে দেন জুয়েলকে, ‘‘গাওয়ার আগে ওকে বলেছিলাম, তুমি কি খেয়েছো? জুয়েল ‘না’ বলায় তাকে নিয়ে একসঙ্গে ভাত খাই। এরপর গান শুরু করি।’’
এরপর জুয়েল বলেছিলেন, ‘আমি তো তখন আর নাই। তারকাদের সম্পর্কে আমাদের যে ধারণা, তাকে (বাচ্চু) দেখে তা ভেঙে গেলো। তিনি খুবই সাধারণ। একসঙ্গে খেতে বসে তিনি আমাকে সহজ করে দিলেন।’
এরপর আইয়ুব বাচ্চুর সুর করা তপন চৌধুরীর গাওয়া ‘আমার গল্প শোনাই’ গানটি গেয়ে শোনান জুয়েল। গানটি জুয়েলের কণ্ঠে শুনে অবাক হয়ে যান আইয়ুব বাচ্চু।
এ প্রসঙ্গে আইয়ুব বাচ্চু বলেন, ‘আমি জুয়েলের কণ্ঠ শুনে তো অবাক। কারণ এ গান তোলা খুব কঠিন ছিল। ও মুখটা গাওয়ার পরেই বলেছিলাম, থাম। আর শোনার দরকার নাই।’
জুয়েল বললেন, ‘ঈদে অ্যালবাম রিলিজ হবে, কিন্তু কোনোভাবেই বস (আইয়ুব বাচ্চু) সময় বের করতে পারছিলেন না। আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। বসকে বললাম, সবাইকে বলেন একটা কাজে ৪ দিনের জন্য বিদেশ যাচ্ছেন। শুধু চন্দনা ভাবি (স্ত্রী) আর খালাম্মা (মা) জানবেন আপনি ঢাকায়। যেই ভাবনা, সেই কাজ। আমরা শান্তিনগরের একটি হোটেলে উঠি। বস, আমি, টুটুল আর ফান্টি (ড্রামার) ভাই। প্রবল উত্তেজনা, উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু হলো। বস একেকটা লিরিক ধরেন, গিটার নিয়ে সুর করেন। ফান্টি ভাই রিদম সেকশন আর টুটুল কিবোর্ডের যত লেয়ার মিউজিক সিকোয়েন্সারে রেকর্ড করে ফেলে।’
দ্বিতীয় দিন বিকালের মধ্যে ১১টি গানের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। বাকি থাকে টাইটেল গান, যেটার সুর আগেই করে ফেলেছেন বাপ্পা মজুমদার। কিন্তু সেই কথা আইয়ুব বাচ্চুকে বলার সাহস পাচ্ছিলেন না জুয়েল। ভয়ে ভয়ে জানানোর পর এবির গম্ভীর জবাব, ‘তোর কি ধারণা আমি এখন আরেকটা ভালো সুর করতে পারবো না?’
এরপর জুয়েলের অনুরোধে গানটির ডেমো শোনেন আইয়ুব বাচ্চু। শোনার পর পছন্দ হয়; হেসে বলেন, ‘সুর আর কথা খুব ভালোরে জুলু! একদম তোর জন্য। চল করে ফেলি। বাপ্পাকে কল দে একটা’।
ওই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে জুয়েল বলেন, “ল্যান্ডফোনে বাপ্পাকে বাড়িতেই পাওয়া গেলো। বস ওকে খুব প্রশংসা করলেন, তারপর বললেন ‘বাপ্পা এই গানটার মিউজিক করে দে’। বাপ্পা ওপাশ থেকে বলেছিল, প্রশ্নই ওঠে না। আমি বললাম, ‘হয় আপনি করবেন, না হলে এ গান দরকার নেই’। বস আবার গিটার তুলে নিলেন হাতে। এভাবেই বাপ্পার সুরে বসের কম্পোজিশনে তৈরি হলো, আমার নিজের গাওয়া সবচেয়ে প্রিয় গান ‘আমার আছে অন্ধকার’।’’
জুয়েলের পরের অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘এক বিকেলে’ (১৯৯৪), ‘আমার আছে অন্ধকার’ (১৯৯৫), ‘একটা মানুষ’ (১৯৯৬), ‘দেখা হবে না’ (১৯৯৭), ‘বেশি কিছু নয়’ (১৯৯৮), ‘বেদনা শুধুই বেদনা’ (১৯৯৯), ‘ফিরতি পথে’ (২০০৩), ‘দরজা খোলা বাড়ি’ (২০০৯) এবং ‘এমন কেন হলো’ (২০১৭)। এছাড়াও বেশ কিছু সিঙ্গেল ও মিশ্র অ্যালবামে গেয়েছেন জুয়েল।