করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র যখন ফের ফুলে-ফেঁপে উঠেছে যার যার অবস্থান থেকে; তখনই বাংলাদেশের সিনেমা যেন পিছিয়ে পড়েছে কয়েক ধাপ। অথচ এই দেশের টিভি নাটক থেকে ওটিটি মাধ্যমও বেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শুধু সিনেমা শিল্পের ইস্যুতে কোথায় যেন একটা রহস্যাবৃত ঘুরপাক খাচ্ছে।
সিনেমা নেই, শিল্পী নেই, প্রেক্ষাগৃহ নেই, প্রযোজক নেই, পরিবেশ নেই, দর্শক নেই, সমিতিগুলোর সততা নেই; যেন রাজ্যের সকল ‘নেই’ জোটবদ্ধ হলো ঢালিউডে এসে। এমন পরিস্থিতি সামলে ওঠার আশায় কিংবা সিনেমার বর্তমান অবস্থান এবং আগামীর নিশানা কিংবা চাঁদমারি নির্ণয়ের জন্য অন্যরকম এক দিনব্যাপী সমাবেশের আয়োজন করেছে টিভি বিনোদন সাংবাদিকদের সংগঠন টেজাব।
শনিবার (১৯ অক্টোবর) বেল ১১টা থেকে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে বসে চলচ্চিত্রের অংশীজনদের নিয়ে ব্যতিক্রমী এই সংলাপ।
এতে অংশ নিয়ে জ্যেষ্ঠ অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, ‘সিনেমা সত্য জানার প্রশস্ত একটি পথ। সেই সিনেমা এখন ভয়াবহ দিকে রূপ নিচ্ছে। দেশের প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিবন্ধকতা ভেবে আমরা যদি থেমে থাকি তাহলে আমাদেরই ক্ষতি। কারণ পুরো বিশ্বে সিনেমা কিন্তু থেমে নেই। বাংলাদেশে টিভি নাটক আগের তুলনায় অনেক কম। তাই বলে নাটক কি বন্ধ হয়ে গেছে? এখন ইউটিউবসহ ওটিটির নানা মাধ্যম এসেছে। সঙ্গে বাজেটও বেড়েছে। সেগুলোতে শিল্পী-কলাকুশলীরা কাজের সুযোগ পাচ্ছে। এটা সত্য, সংস্কৃতি তার পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু আমাদের কাজের মান বাড়ছে না। চলচ্চিত্রে আমরা যদি কাজের মান বাড়াতে পারি তাহলেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারবো।’
এর আগে টেজাবের সভাপতি চ্যানেল টোয়েন্টিফোর-এর বিনোদন সম্পাদক নাজমুল আলম রানার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক একাত্তর টিভির সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক বুলবুল আহমেদ জয়ের সঞ্চালনায় ‘চলচ্চিত্রের চাঁদমারি: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’ শিরোনামের প্রবন্ধ পাঠ করেন চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক বিধান রিবেরু।
সংলাপে যোগ দিয়ে তারিক আনাম খান আরও বলেন, ‘আমরা যদি ভারতীয় শিল্পীদের কথা বলি তাহলে রাজনীকান্তের কথা বলতেই হয়। কীভাবে তিনি এই বয়সেও কাজ করে চলেছেন। তাদের নিয়ে গল্প হচ্ছে। সেগুলো গল্প আবার সুপারহিট তকমা পাচ্ছে। এখনও তার সিনেমা দেখার জন্য ভোর চারটায় মানুষ লাইন ধরে টিকিট কাটছে। কী আছে সেই সিনেমায়? আমাদের এমন জায়গা তৈরি করতে হবে।’
দেশে সিনেমার মার্কেট আছে শত কোটি টাকার। যেসব সিনেমা হল চালু আছে, সেগুলোতে যদি টানা দুই মাস মুক্তি প্রাপ্ত ছবি ভালো চলে, তবে শত কোটি টাকা ব্যবসা করা সম্ভব বলে বলে মনে করেন প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল।
তিনি বলেন, ‘ফিল্মে কিছু পলিসি আছে এগুলো অতি দ্রুত চেঞ্জ করা উচিত। যদি চেঞ্জ করা যায়, তবে যে কোনও সিনেমা মোটামুটি ভাবে রেভিনিউ তুলে আনা সম্ভব। গল্পের প্রয়োজনে অনেক ভায়োলেন্স বা সত্যটা দেখাতে গেলে সেটা দেখানো যায় না। নতুন যে সার্টিফিকেশন বোর্ড হয়েছে আগের থেকে এখানে কি কি পার্থক্য এবং আইন আছে সে বিষয়গুলো ভালোভাবে জানানো উচিত। বাংলাদেশের যে সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো আছে সেগুলোতে কত টাকা টিকিট বিক্রি হচ্ছে তা ঠিকঠাক হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। হলে প্রতিনিধি পাঠানো হয় প্রতিনিধিকে পাহারা দেয়ার জন্য আরেকজন প্রতিনিধি পাঠাতে হয়। এতে করে সরকার ঠিকভাবে ট্যাক্স পাচ্ছে না। সরকার যদি বক্স অফিস ও ই-টিকিটিং ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে সঠিক ট্যাক্স পাবে এবং আমরা ব্যবসা করতে পারব।’
প্রযোজক আব্দুল আজিজের কথায়, ‘সরকার প্রতিবছর বিশ কোটি টাকা সিনেমায় অনুদান দিচ্ছে। এটা বন্ধ করে তিনটি সিনেপ্লেক্স করে দেয়া উচিত। এতে ইন্ডাস্ট্রি ঠিক হবে। যেভাবে অনুদান দেয়া হয় এতে ইন্ডাস্ট্রির কোনও লাভ হয় না। পাশাপাশি যৌথ প্রযোজনার নিয়মগুলো চেঞ্জ করা উচিত। এতে করে দুই দেশে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব হবে। যৌথ প্রযোজনার সিনেমাগুলো দিয়েই আমরা অতীতে দেখেছি দর্শকের ঢল নেমেছে।’
অন্যদিকে নির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘আমাদের দেশে সিনেমা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরকার। যেখানে পুরো বিশ্বের সিনেমার বড় বড় লোকদের নিয়ে ক্লাস করানো হবে। এই কাজটা খুব বেশি বড় কাজ নয়। সরকার যদি মনে করে এবং রাজনৈতিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেই এটা সম্ভব। আর দেশে ব্যক্তিগতভাবে হলেও আমাদের কিছু স্টুডিও দরকার। যেখানে আমরা পয়সা দিয়ে হলেও কাজ করতে পারবো। এছাড়া সিনেমা সংক্রান্ত একটি সার্ভার খুবই প্রয়োজন সেখান থেকে পুরো দেশে আমরা চলচ্চিত্র পরিবেশন করতে পারবো।’
টেজাব-এর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা উপকমিটির সদস্য সচিব এবং যমুনা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আহমেদ তাওকীর জানান, সংগঠনের উদ্যোগে এমন সংলাপের আয়োজন নিয়মিত করা হবে। তার ভাষায়, ‘সিনেমা ও সাংবাদিকতার উন্নয়নে আমরা নিয়মিত কাজ করে যেতে চাই। যার প্রথম ধাপ ভালোভাবে পার করেছি আজ। আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রত্যেককে, যারা যারা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন এবং নিজেদের মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করেছেন।’