নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই একরকম তুলকালাম চলছে সোশ্যাল হ্যান্ডেলে। বেশিরভাগই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নিয়ে যেন তিনি অপরাধী বনে গেলেন রাতারাতি। উঠে আসছে তার নানামাত্রিক পলিটিক্যাল অতীত। এমনকি সমালোচনার তীর থেকে রেহাই পাচ্ছেন না দেশের অন্যতম অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাও। কারণ তিনি নির্মাতার সহধর্মিণী।
ফারুকীও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তীরবিদ্ধ হয়ে ছটফট করছেন বটে, তবে লড়াইটা চালু রাখলেন, প্রতিউত্তর করে। মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) জাতির উদ্দেশ্যে লিখেছেন এক দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া। অতীত ও বর্তমান বিষয়ে জানিয়েছেন নিজের স্পষ্ট অবস্থানের কথা। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রিত্ব আমার কাছে কোনও অর্জন না, পাবলিক সারভেন্টের দায়িত্ব মাত্র।’
শুরুটা করেন এভাবে, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, ঘুণাক্ষরেও যা আগে ভাবি নাই, এখন আমাকে সেটাই করতে হচ্ছে। যাই হোক শুরু করি। আমি মাত্রই দুই দিন হলো কাজ করছি। এর মধ্যে আমার ধারণা আমার মন্ত্রণালয়ে সহকর্মীদের মাঝে এই ধারণা দিতে পেরেছি যে আমরা কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটাতে চাই, যেটা স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সংস্কৃতি কর্মীদের কাজে আসবে। যাই হোক, যদিও আমি কোনও পদ চাই নাই, তবুও দায়িত্বটা নেয়ার পর আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে করার চেষ্টা করছি।’
সমালোচকদের এমন বয়ানে অনেকটাই বিষণ্ণ ও অপমানিত ‘ডুব’ নির্মাতা। তিনি জানান, ‘আমি আমার চেয়ারের জন্য কোনও সাফাই দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। কিন্তু শিল্পী হিসাবে অপমানিত বোধ করেছি বলেই কয়টা কথা বলছি।’
কথাগুলো এমন, ‘‘শাহবাগ আন্দোলন যখন শুরু হয় আর সবার মতো আমিও ভেবেছিলাম এটা নির্দলীয়। যে কারণে আমার সব পোস্টে এটাকে ঠেলে ‘রাষ্ট্র মেরামতে’র অ্যাজেন্ডার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই যখন বুঝে যাই, তখনই লিখি ‘কিন্তু এবং যদির খোঁজে’। যে কিন্তু এবং যদি শাহবাগ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো। বাঙালী জাতীয়তাবাদ আর ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে আজকের যে ফ্যাসিবাদের সূচনা করা হয়েছিলো তার প্রতিবাদে লিখি, ‘এই চেতনা লইয়া আমরা কি করিবো’। ২০১৪ সালে। এই দুইটা লেখার যে কোনও একটা লেখা ছাপা হওয়ার পর বিএনপির শিমুল বিশ্বাস সাহেব ফোন দিয়েছিলেন কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য! আমি কোনও দল করি না। কিন্তু আমি আওয়ামী লীগ হলে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা আমার লেখায় কি খুঁজে পেলেন যে, আমার সাথে পরিচয় না থাকা স্বত্বেও আমার নম্বর জোগাড় করে ফোন দিলেন?’’
এদিকে অনেক সমালোচক ফারুকীকে ভারতপন্থী বলেও দাবি তুলছেন। সে বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে এই নির্মাতা বলেন, ‘অনেকে বলছে, আমি ভারতীয় হেজেমনির অংশ। যে লোককে বাংলাদেশের কালচারাল এস্টাবলিশমেন্ট ঘৃণা করে আমি কলকাতা কেন্দ্রিক ভাষার হেজেমনি ভেঙে দিয়েছি বলে, সেই কিনা এই হেজেমনির অংশ!!! আমি পৃথিবীর কোনও দেশেরই ঢালাও নিন্দা করি না। কারণ দেশে নানা চিন্তার মানুষ থাকে। আমি সবার সাথেই কথা বলতে চাই, কাজ করতে চাই। কিন্তু আমার দেশের ক্ষতি হলে, আমি তার বিরুদ্ধে বলতে কুণ্ঠা করি না। ফেলানীর মৃত্যুর পর কি পোস্ট দিয়েছিলাম ২০১৩ সালে সেটা দেখতে পারেন নীচে।’
শেষাংশে ফারুকী জানান, তিনি আসলে কোনও বিপ্লবী নন। তার মূল পরিচিতি ও কাজ হচ্ছে সিনেমা নির্মাণ। জানান, ফিল্মমেকার হিসেবেই তিনি মারা যেতে চান, মন্ত্রী হিসেবে নয়। তার ভাষায় মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট, ‘আমি তো কোনও বিপ্লবী নই। ছিলাম না কোনও কালে। আমি ফিল্মমেকার। ঘটনাচক্রে এবং আল্লাহর রহমতে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমি আমার সেই পরিচয়েই গর্বিত। আমি মারা গেলে আমাকে ফিল্মমেকার হিসাবেই মনে রাখা হবে, মন্ত্রী হিসাবে না। ফলে মন্ত্রিত্ব আমার কাছে কোনও অর্জন না, পাবলিক সারভেন্টের দায়িত্ব মাত্র। আমি এটা ফাইনালি অ্যাকসেপ্ট করেছি নিজের ফিল্মের বাইরেও আমার দেশকে কিছু দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ দিয়েছে- এটা বিশ্বাস করেছি বলে। আমার মনে হয়েছে, জীবনের এই পর্যায়ে এসে নিজের লাভ-ক্ষতি না ভেবে এই ক্ষমতা দেশের কাজে লাগাই।’