নিয়ানডার্থাল থেকে হোমোস্যাপিয়েন্স- মানুষ বিবর্তনের ভেতর দিয়েই পৃথিবীর পথ চলছে। বিবর্তন এক চলমান প্রক্রিয়া। মানুষের যে ধরণের বিনোদনের চাহিদা, সেসবের মূল বুনিয়াদ শত শত বছর ধরে একই রকমের ছিল। মানে মানুষ সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া ইত্যাদিতে বিনোদিত হয়ে আসছে শত শত যুগ ধরে। এই সমস্ত বিনোদনের ঘরানা বা বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে বটে, কিন্তু কখনও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেনি।
মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা বা গভীরতার ব্যবহার যত কম করে, পুঁজিবাদের ততই সুবিধা হয়। পুঁজিবাদ অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং কার্যকরভাবে এই কাজটা করতে পেরেছে। একবার ভাবুন আপনার গাড়ি আছে, অথবা নানা রকমের পরিবহন আছে, সবখানে লিফটে চড়েন-এর পরও নিয়ম করে অন্তত ৪৫ মিনিট হাঁটেন কেন? কারণ না হাঁটলে আপনার শরীর ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়বে। ঠিক একইভাবে আপনি যদি মগজের চর্চা না করেন, তাহলে আপনার মস্তিষ্কও অসাড় হয়ে পড়বে।
ক্রমাগত অটোমেটেড হতে থাকা দুনিয়াতে আপনার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে কি না বলুন? ঠিক এখানেই পুঁজিবাদ তার চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছে, সফলভাবে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সীমাবদ্ধ করতে পেরেছে এই পুঁজিবাদ। এই একই পৃথিবীতে যেই মানুষ চার দিনের টেস্ট ক্রিকেট উপভোগ করত, অথবা সাড়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা- সেই মানুষ পারলে টি-টেন দেখে, সিনেমা মেরেকেটে ৭০ মিনিট হলেই ভালো বলে। মানুষকে এতটা ব্যস্ত বা অস্থির কে বানাল? নিশ্চয়ই পুঁজিবাদ। এসবেরই ধারাবাহিকতায় আমরা বিনোদনের চিরাচরিত মাধ্যমগুলোর চোখের সামনে মৃত্যু ঘটতে দেখছি। গোটা বিশ্বের বিনোদনের মাধ্যম এবং ধরণে পরিবর্তন আসছে। চিরাচরিত বিনোদন মাধ্যমগুলোর আয়ু যে আর খুব বেশী দিন নাই, সেকথা বলাই বাহুল্য।
পৃথিবীতে রাজনৈতিকভাবে অসচেতন বা অপরিণত কোনও জাতি যদি থেকে থাকে বাঙ্গালি তার মধ্যে অন্যতম। অথচ গত জুলাই আন্দোলনের সময় থেকে বাংলাদেশে রাজনীতিই সব থেকে বড় চর্চার বিষয় বা প্রকারান্তরে বিনোদনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভিউ ব্যবসার এই যুগে নাটক, সিনেমা, সংগীতে যারা কোটি কোটি টাকা লগ্নি করে বসে আছেন, তাদের রীতিমতো পথে বসার অবস্থা। মানুষের সার্বক্ষণিক আলাপ এবং কৌতূহলের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক ঘটনাবলী পর্যালোচনা, পর্যবেক্ষণ এবং মতামত প্রকাশ। দেশের প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ এবং প্রচ্ছন্নভাবে নেহাতই বিনোদনের বিষয়ে পরিণত হবার কারণে আমাদের কোনও রাজনৈতিক মুক্তিও ঘটছে না।
বর্তমান সময়ে যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে কেউ এইরকমের হযবরল কাণ্ড রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখেছে বলে আমার মনে হয় না। তথাপি সরকার এবং সরকারের তৈরি তথাকথিত প্রেশার গ্রুপের দৌরাত্ম্য একটুও কমছে না। কোনও প্রকার জনসমর্থন ছাড়া এসব করে টিকে থাকার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল! এদেশের মানুষ রাজনৈতিক আলাপের
আফিমে বুঁদ হয়ে আছে, সে আর মুক্তির পথ খোঁজে না!
একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই জাতি ফ্যাসিবাদের বাইরে কোনোকালে অন্য কিছু দেখেনি। এই দেশে সবসময়েই ফ্যাসিবাদ কায়েম ছিল। জাতি মোটামুটি এতেই অভ্যস্ত। প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা নিয়ে। দক্ষতা না থাকলে হযবরল হবে, হয়েছেও তাই। সবার আগে মেনে নিতে হবে আমরা জাতিগতভাবে অসৎ, ফলে এই দেশে সৎ লোকের শাসন সুদূরপরাহত। আমাদের এখন এইটুকু বলা বাকি যে-আপনারা চুরি করেন, কিন্তু দয়া করে সেটারও একটা কাঠামো বা নিয়মতান্ত্রিকতা তৈরি করে নিয়ে করেন।
তবে আশার কথা হলো, একটা গণঅভ্যুত্থান করে জাতি ১৫ দিনে ১৫ বছরের সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম, সেটা দেখাতে পেরেছে। এটুকু ভেবে হলেও যে কোনও সরকারের জাতিকে খানিকটা সমীহ করা উচিত। আর নিরাশার কথা হলো এই, টাটকা ইতিহাস থেকে কেউ কোনও শিক্ষা নেয় নাই।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশব্যাপী প্রাচীন সমস্ত মাজার ভাঙা হয়েছে। এটাকে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূত্রপাত বলা যেতে পারে। দেশজুড়ে ভাস্কর্য নিধনের এক মহোৎসব চলেছে, এই একই প্রবণতা আমরা আফগানিস্তানে দেখেছি। আর যদি খুব চোখে পড়ার মতো কোনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করতে হয়, তাহলে পহেলা বৈশাখে শেখ হাসিনার ব্যঙ্গাত্মক প্রতিকৃতি এবং জাতীয় অনুষ্ঠান মানেই ড্রোন শো! সেই ড্রোন শোতে বাংলাদেশ মানেই ২০২৪-এর জুলাই! ৪৭ থেকে ৯০-যেন বাংলাদেশের আর কোনও ইতিহাস নাই। এই সকল সাংস্কৃতিক(!) কর্মকাণ্ডে মনে হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন বাংলাদেশের কেবলমাত্র ছাত্রসমাজ ও সমন্বয়ক ছাড়া অন্য বয়স এবং শ্রেণির মানুষের অভিজ্ঞতা অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয়। অথচ জীবন বুঝে উঠতেই মানুষের অন্তত চল্লিশটা বছর পার করতে হয়, রাষ্ট্র তো আরও জটিল বিষয়। সে কারণেই ছাত্র রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতি বলে দু’টো আলাদা বিষয় রয়েছে।
সব থেকে অবাক লাগে জাতির একটা অংশের পাকিস্তান তোষণ। কোনও পরাজিত শক্তির পেছনে এমন ছ্যাবলার মতো কেউ কখনও ঘুরেছে বলে শুনি নাই। এটার কারণ যদি ধর্মীয় হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হয় মক্কা-মদিনার মতো পাকিস্তানে মুসলিমদের কোনও পুণ্যস্থান আছে বলে তো শুনি নাই। সব থেকে মজার বিষয় হলো বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক মানুষের পাকিস্তান প্রেম নিয়ে খোদ পাকিস্তানের কোনও মাথাব্যথা নেই। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে মোটামুটি দেউলিয়া দেশটি নিজেদের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত। বিষয়টা খানিকটা এমন, আপনি একটা মেয়েকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সে অনাগ্রহে বার বার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অথচ আপনি বুঝতেই চাইছেন না আপনার এখন থামা উচিত।
রাষ্ট্রের এই হযবরল সর্বত্র বিরাজমান। দেশের মিডিয়া অঙ্গন তার বাইরে নয়। সে ক্রীড়াঙ্গন হোক আর সিনেমায় সরকারি অনুদান হোক, অসঙ্গতি এবং অব্যবস্থাপনা ইতিহাসের যেকোনও সময়কে পেরিয়ে গিয়েছে।
বিনোদন এবং দৈনন্দিন জীবনে এআই এক নতুন সংযোজন। মানুষ এখন এআই-এ মেতেছে। তবে যেহেতু বাঙালি জাতির মজ্জাগত বালখিল্য রয়েছে- এআই ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহারের প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের ওপরে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় মানুষের চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা আমরা দেখেছি। দগ্ধ-বিপন্ন মানুষকে সহযোগিতার বদলে ২৫ টাকার পানি ৬০০ টাকায় বিক্রি, ১০ মিনিটের পথের সিএনজি ভাড়া ১০০০ টাকার নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি মানুষের নির্বিকার কনটেন্ট বানানোর নিষ্ঠুরতা আমরা দেখেছি। এর সাথে দেখেছি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নিয়ে এআই দিয়ে বানানো চূড়ান্ত অসংবেদনশীল কিছু কনটেন্ট। পাইলটের শেষ মুহূর্তের আলাপ, জাতির কাছে তার এবং তার স্ত্রীর ক্ষমা চাইবার মতো এআই জেনারেটেড ফেইক কনটেন্টের ছড়াছড়ি চারিদিকে। মানবতার ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে এই কনটেন্ট ব্যবসা। আমরা সব সময়ে জেনে এসেছি, প্রযুক্তি যতটা না ভয়ানক- ততোধিক ভয়ানক হয়ে ওঠে এর ব্যবহারকারীর কারণে। এই দেশে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত ঠাট্টা-মশকরা এবং সত্যকে মিথ্যা বানানোর কাজে। এরা বুঝতেই পারছে না, এআই প্লেগারিজম বা ম্যানুপুলেশনের কাজে ব্যবহার না করে ক্রিয়েশনের কাজে ব্যবহার করতে হবে। এআই দিয়ে দুর্দান্ত সব সৃজনশীল এবং শিল্পসম্মত কাজ হচ্ছে গোটা বিশ্বে।
এআই ভবিষ্যতের বাস্তবতা, আমাদের বর্তমানই যথেষ্ট এআই নির্ভর। কিন্তু এআই’র হাস্যকর এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিরক্তিকর ব্যবহার বাংলাদেশকে বরাবরের মতোই গোটা বিশ্ব থেকে পিছিয়ে রাখবে। যেমনটা পিছিয়ে আছি রাজনীতিতে।
লেখক: নির্মাতা, সংগীতশিল্পী ও চিন্তক