রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার, কু ক্লাক্স ক্ল্যানের বর্ণবাদী ভূমিকা, সাবেক গ্যাংস্টার যমজ ভাই, মিসিসিপি ডেল্টার লোককথা ও ব্লুজ সংগীতের মূর্ছনা– সবকিছু মিশিয়ে বানানো ‘সিনার্স’ এমন অভূতপূর্ব সাফল্য পাবে, কে ভেবেছিল! উল্টো ১০ কোটি ডলার বাজেটে নির্মিত ভ্যাম্পায়ার-হরর ছবিটি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আগেভাগে ধরে নিয়েছিলেন অনেক হলিউড বিশ্লেষক। কারণ ভ্যাম্পায়ার কিংবা হরর ঘরানার ছবি সবশ্রেণির ও সব বয়সী দর্শকদের সমান ভালো লাগে না। কিন্তু ‘সিনার্স’ সবাইকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। ভরাডুবির বদলে প্রেক্ষাগৃহে টিকিট বিক্রিতে রীতিমতো ঝড় তুলেছে রায়ান কুগলার পরিচালিত ছবিটি।
অনেকের ভবিষ্যদ্বাণীকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে অবাক করা সাফল্য পেয়েছে ‘সিনার্স’। হলিউডে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ব্যবসাসফল মৌলিক গল্পের চলচ্চিত্রের মধ্যে এটি অন্যতম। বক্স অফিস কাঁপানোর পর ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের মনোনয়ন তালিকায় ২০২৫ সালের সব ছবিকে টপকে গেছে ‘সিনার্স’। শুধু তাই নয়, সর্বাধিক ১৬টি বিভাগে মনোনীত হওয়ার মাধ্যমে অস্কারে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে এই ছবি। হলিউডের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটির ইতিহাসে কোনও ছবির এটাই সর্বোচ্চ মনোনয়ন প্রাপ্তির রেকর্ড। এর আগে বিভিন্ন আসরে সর্বোচ্চ ১৪টি করে মনোনয়ন পাওয়ার রেকর্ড গড়েছিল ‘টাইটানিক’ (১৯৯৭), ‘লা লা ল্যান্ড’ (২০১৬) ও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ (১৯৫০)।
‘সিনার্স’ প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে যাওয়া সাফল্য তো পেয়েছেই, পাশাপাশি অস্কারে ভৌতিক ছবির সচরাচর গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ার প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। ভ্যাম্পায়ার ঘরানাকে স্বীকৃতি দিতে সাধারণত অ্যাকাডেমি সদস্যদের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। কিন্তু ‘সিনার্স’-এর বেলায় ঘটেছে উল্টোটা। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি ডেল্টায় ১৯৩০-এর দশকের প্রেক্ষাপটে এতে ব্লুজ সংগীতের সঙ্গে হরর ঘরানার মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে দক্ষ হাতে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে ‘দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস’ ভৌতিক ঘরানার ছবি হিসেবে সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জিতেছে। ৩৫ বছর পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসানোর দৌড়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘সিনার্স’। সব মিলিয়ে, ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কারের শীর্ষ দাবিদার হয়ে উঠেছে এটি।
২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল বড় পর্দায় মুক্তি পায় ‘সিনার্স’। বছরের এত আগে প্রেক্ষাগৃহে আসার পরও অ্যাকাডেমি ভোটারদের মধ্যে ঠিকই আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে ছবিটি। এর গল্পে দেখা যায়, ১৯৩০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল মিসিসিপি ডেল্টায় ফিরে যমজ দুই ভাই একটি জুক জয়েন্ট (গান-বাজনার আড্ডাস্থল) গড়ে তোলে। একপর্যায়ে এটি রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারদের আক্রমণের শিকার হয়। গ্যাংস্টার দুই ভাই ও ভ্যাম্পায়ারের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে বর্ণবিভাজন ও বর্ণবাদের ভয়াবহ বাস্তবতাকে রূপকভাবে তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে।
যমজ দুই ভাইয়ের ভূমিকায় দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সের জন্য অস্কারে সেরা অভিনেতা বিভাগে মনোনীত হয়েছেন আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ তারকা মাইকেল বি. জর্ডান। এটাই তার প্রথম অস্কার মনোনয়ন। ছবিটিতে ভূতপ্রেত বশীভূত করা পুরোহিত অ্যানি চরিত্রের জন্য ব্রিটিশ-নাইজেরিয়ান তারকা উনমি মোসাকু সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জায়গা পেয়েছেন। তার মনোনয়ন মোটামুটি প্রত্যাশিতই ছিল। কাকতালীয় হলো, শৈশবে অভিনয়ের প্রতি ভালো লাগা থেকে স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনই ‘অ্যানি’ (১৯৮২) ছবিটি দেখতেন মোসাকু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।
‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ খ্যাত পরিচালক রায়ান কুগলার ‘সিনার্স’-এর জন্য সেরা পরিচালনা ও সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যের জন্য প্রথমবার আর সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে প্রযোজক হিসেবে দ্বিতীয়বার মনোনীত হয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সী এই কৃষ্ণাঙ্গ নির্মাতার স্ত্রী জিঞ্জি কুগলার ও ব্যবসায়িক অংশীদার সেভ ওহানিয়ান যৌথভাবে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন। তারা প্রথমবার অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছেন। রায়ান কুগলার এর আগে ‘জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া’ (২০২১) প্রযোজনার জন্য সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনীত হন। এর পরের বছর ‘ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরেভার’ ছবিতে ব্যবহৃত ‘লিফট মি আপ’-এর গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তিনি পান সেরা মৌলিক গান বিভাগের মনোনয়ন।
‘সিনার্স’ আরও মনোনয়ন পেয়েছে সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা পোশাক পরিকল্পনা, সেরা রূপসজ্জা ও চুলসজ্জা, সেরা মৌলিক আবহ সংগীত, সেরা মৌলিক গান, সেরা শিল্প নির্দেশনা, সেরা চলচ্চিত্র সম্পাদনা, সেরা শব্দ, নতুন চালু হওয়া সেরা কাস্টিং ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বিভাগে। ছবিটির চিত্রগ্রাহক অটাম ডুরাল্ড আরকাপো অস্কারের সেরা চিত্রগ্রহণ বিভাগে মনোনীত চতুর্থ নারী। এর আগে এই বিভাগে জায়গা পান র্যাচেল মরিসন (মাডবাউন্ড, ২০১৭), আরি ভেগনার (দ্য পাওয়ার অব দ্য ডগ, ২০২১) ও ম্যান্ডি ওয়াকার (এলভিস, ২০২২)।
হলিউডের ১০২ বছরের পুরোনো স্টুডিও ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্স ‘সিনার্স’ ছবিতে অর্থলগ্নি করেছে। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি বহুল আলোচিত চুক্তির সুবাদে হলিউডের বাণিজ্য বিষয়ক প্রকাশনাগুলোতে খবরের শিরোনাম হন রায়ান কুগলার। চুক্তি অনুযায়ী ২৫ বছর পর ‘সিনার্স’ ছবির মালিকানা স্বত্ব তার কাছে ফিরে আসবে। বর্তমানে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স ও নামজাদা স্টুডিও প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের মধ্যে ওয়ার্নার ব্রাদার্স কিনে নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। এরমধ্যে এবারের অস্কারে সর্বাধিক ৩০টি মনোনয়ন বাগিয়ে স্টুডিওগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ওয়ার্নার ব্রাদার্স। দ্বিতীয় সর্বাধিক ১৩টি বিভাগে মনোনীত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ ছবিটিরও প্রযোজক-পরিবেশক এই সংস্থা। বক্স অফিসে যখন সিক্যুয়েল ও সুপারহিরোরা আধিপত্য বিস্তার করছে, তখন মৌলিক গল্পের ব্যবসাসফল ও সমালোচক প্রশংসিত কিছু ছবি উপহার দিয়েছে স্টুডিওটি।
তবে মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে থাকা ছবিই যে সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতবে, সবসময় এমন ঘটে না। গত ২১ বছরে সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জিতেছে মাত্র ছয়টি সিনেমা। ফলে ‘সিনার্স’কে পেছনে ফেলে এই জিতে নিতে পারে রাজনৈতিক অ্যাকশন থ্রিলার ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। কারণ গোল্ডেন গ্লোবস ও ক্রিটিস চয়েজ অ্যাওয়ার্ডসে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। এবারের অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে বিবেচিত হয়েছে মোট ২০২টি ছবি। এরমধ্যে ১০টি সিনেমা তালিকায় স্থান পেয়েছে। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রযোজনা দুটি ছাড়াও সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে গথিক কল্পবিজ্ঞানধর্মী ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’, শেক্সপিয়রের পরিবারের গল্পে অনুপ্রাণিত ‘হ্যামনেট’, টেবিল টেনিস খেলা নিয়ে ‘মার্টি সুপ্রিম’, ব্ল্যাক কমেডি ‘বুগোনিয়া’, ফর্মূলা ওয়ান প্রতিযোগিতা নিয়ে ‘এফওয়ান’, ঐতিহাসিক রাজনৈতিক থ্রিলার ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’, পারিবারিক ড্রামা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ ও ঐতিহাসিক ড্রামা ‘ট্রেন ড্রিমস’। সামগ্রিকভাবে মনোনীত ছবিগুলো নানান ঘরানার, এতে প্রমাণ পাওয়া যায়– অ্যাকাডেমি সদস্যরা ক্রমে প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা গল্পকে স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। তাছাড়া মনোনয়নপ্রাপ্ত কয়েকটি ছবি বাণিজ্যিকভাবেও বেশ সফল। এর ফলে অস্কার অনুষ্ঠানের দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।