গ্র্যামিজয়ী ব্যাড বানি: গায়কই নন, বিপ্লবীও তিনি

সংগীত দুনিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের রেকর্ড বই লেখা হলো নতুন করে। গ্র্যামির ৬৮তম আসরের শীর্ষ পুরস্কার ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ জিতে ইতিহাস গড়েছে লাতিন র‍্যাপ তারকা ব্যাড বানি’র ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’। এবারই প্রথম স্প্যানিশ ভাষার কোনও অ্যালবাম এই স্বীকৃতি পেলো। আমেরিকান দুই সংগীতশিল্পী কেন্ড্রিক লামার ও লেডি গাগার সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াইয়ে তাদের পেছনে ফেলে বিজয় মুকুট পরেছেন ব্যাড বানি। তিনিই প্রথম লাতিন শিল্পী, গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের ৬৮ বছরের ইতিহাসে যার হাতে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার উঠলো। এর মাধ্যমে গ্র্যামির আলো কেড়ে নিলেন তিনি।

ব্রিটিশ তারকা হ্যারি স্টাইলস ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতেই অবাক হয়ে যান ব্যাড বানি! মঞ্চে ওঠার আগে নিজেকে সামলাতে কয়েক মুহূর্ত সময় নেন। পুরস্কার জয়ের অনুভূতি জানানোর সময় তার চোখে ছিল জল। ৩১ বছর বয়সী এই পুয়ের্তোরিকান গায়ক ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ ট্রফি গ্রহণ করে গ্র্যামি-মঞ্চে স্প্যানিশ ভাষায় বলেন, ‘আমি এই পুরস্কার উৎসর্গ করতে চাই সেই অভিবাসীদের, যারা নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন। যারা প্রিয় কাউকে হারিয়েছেন ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন, এই পুরস্কার আপনাদের জন্য।’

যে মন্তব্যে স্পষ্ট, গ্র্যামিজয়ী ব্যাড বানি শুধু গায়কই নন- বিপ্লবীও বটে!‘দেবি তিরার মাস ফতোস’ অ্যালবামের প্রচ্ছদ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’-এর অর্থ

‘দেবি তিরার মাস ফতোস’ হলো ব্যাড বানির ষষ্ঠ স্টুডিও অ্যালবাম। এর নামের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘আমার আরও বেশি ছবি তোলা উচিত ছিল’। এর মাধ্যমে কাছের মানুষ, প্রিয়জন ও বন্ধুদের সঙ্গে সান্নিধ্যে থাকার সময় মানুষের ছবি তোলার প্রবণতাকে তুলে ধরেছেন তিনি। অ্যালবামের গানগুলোতে রয়েছে র‌্যাগে, সালসাসহ বেশ কিছু লাতিন সংগীতধারা। ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’কে ক্যারিবীয় দ্বীপভূমি পুয়ের্তোরিকোর প্রতি তার সুরেলা শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে দেখছেন সংগীত সমালোচকরা। নিজের শেকড়ের সংগীত ইতিহাসকে উদযাপন করে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।

গত বছরের নভেম্বরে লাতিন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জেতার পর থেকেই ৬৮তম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’-এর জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছিলেন বিশ্লেষকরা। সেটাই শেষমেষ সত্যি হলো।

কে এই ব্যাড বানি?

ব্যাড বানির প্রকৃত নাম ‘বেনিতো আন্তোনিও মার্তিনেস ওকাসিও’। এবারের গ্র্যামিতে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’সহ তিনটি পুরস্কার জিতেছেন তিনি। ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’ সেরা আরবান মিউজিক অ্যালবাম বিভাগের সম্মানও পেয়েছে। এছাড়া এই অ্যালবামের ‌‘ইওও’ গানটি সেরা গ্লোবাল মিউজিক পারফরম্যান্স বিভাগের স্বীকৃতি বাগিয়ে নিয়েছে।

ব্যাড বানি তিনটি গ্র্যামি জয়কে লাতিন সংগীতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে অ্যাংলোফোন (ইংরেজিভাষী) সংগীতশিল্পে লাতিন সংগীতকে একপাশে সরিয়ে রাখার প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়। তবে অডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ভাষার দেয়াল ভেঙে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। গত বছর স্পটিফাইয়ে সবচেয়ে বেশি (১৯৮ কোটি বার) বেজেছে ব্যাড বানির গান। বিশ্বের সব সংগীতশিল্পীর চেয়ে একজন লাতিন র‌্যাপারের এমন শ্রোতাপ্রিয়তা বিস্ময়করই বলা চলে।বক্তব্য রাখছিলেন ব্যাড বানিরাজনৈতিক ইঙ্গিত

গ্র্যামিতে ব্যাড বানির স্বীকৃতি পাওয়ার ঘটনায় রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেখছেন সমালোচকরা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) আমেরিকার বিভিন্ন শহরে যে ধরপাকড় অভিযান চালাচ্ছে, এসবের তীব্র সমালোচক তিনি। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমননীতির প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন এই গায়ক। নিজের সাম্প্রতিক কনসার্ট ট্যুরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডকে এড়িয়ে গেছেন তিনি। তার শঙ্কা ছিল– গান শুনতে আসা অভিবাসী ভক্তদের গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে পারে ফেডারেল এজেন্টরা।

গ্র্যামিতে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন ব্যাড বানি। সেরা আরবান মিউজিক অ্যালবাম বিভাগের পুরস্কার জয়ের পর মঞ্চে উঠে ফেডারেল এজেন্টদের অভিবাসীবিরোধী কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার আগে আমি বলবো– আইস আউট।’

মিনিয়াপোলিসে সম্প্রতি দুই নিরীহ মানুষের মৃত্যুর ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে ব্যাড বানি বলেন, ‘আমরা বর্বর নই, আমরা পশু নই, আমরা ভিনগ্রহের কেউ নই। আমরা মানুষ ও আমরা আমেরিকান।’

ব্যাড বানি আরও বলেন, ‘ঘৃণার চেয়ে শক্তিশালী একমাত্র শক্তি হলো ভালোবাসা। সহমর্মিতা দিয়ে নিষ্ঠুরতাকে মোকাবিলা করতে হবে। আমরা আমাদের মানুষদের ভালোবাসি। আমরা আমাদের পরিবারকে ভালোবাসি।’ গ্র্যামিতে ট্রেভর নোয়া ও ব্যাড বানিসুপার বোল বিতর্ক

গান গাওয়ার সুবাদে তিনটি পুরস্কার জিতলেও এবারের গ্র্যামি-মঞ্চে কোনও পরিবেশনায় অংশ নিতে পারেননি ব্যাড বানি। কারণ সুপার বোলের হাফটাইম শোতে সংগীত পরিবেশনের চুক্তি অনুযায়ী তিনি টিভিতে সম্প্রচারিত কোনও অনুষ্ঠানে আপাতত গাইতে পারবেন না। ব্যাড বানি এবার সুপার বোলের হাফ-টাইম শোতে সংগীত পরিবেশন করতে যাচ্ছেন। সেজন্য চুক্তিগত বাধ্যবাধকতায় তিনি অন্য কোথাও পারফর্ম করতে পারবেন না। ঠিক যেমন গত বছর কেন্ড্রিক লামারের ক্ষেত্রে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্রিপ্টো ডটকম অ্যারেনায় গ্র্যামির জমকালো আয়োজনে তবুও সঞ্চালক দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া প্রলুব্ধ করে বিপদে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ব্যাড বানিকে! গায়ককে জিজ্ঞেস করেন নোয়া, ‘অন্য সবাইকে পারফর্ম করতে দেখে কি একটু ঈর্ষা হচ্ছে না?’ হেসে ব্যাড বানি জবাব দেন, ‘হয়তো একটু।’ এরপর গ্র্যামির সঞ্চালকের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নোয়ার দিকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি। এর জবাবে ব্যাড বানির গানের লাইন উদ্ধৃত করে সঞ্চালক বলেন, ‘আমার আরও বেশি ছবি তোলা উচিত ছিল! যখনই সুযোগ হয়েছে, আরও বেশি আলিঙ্গন করা ও চুমু দেওয়া উচিত ছিল।’ ব্যাড বানি হেসে জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা কি আমার গানের ইংরেজি অর্থ?’

তারপর নোয়া মূল স্প্যানিশ লিরিকে ঢুকে পড়েন, ‘যদি আজ আমি মাতাল হই, তাহলে ওরা আমাকে সাহায্য করবে।’ হঠাৎ একটি ব্যান্ড পার্টি হাজির হয়ে ব্যাড বানিকে তার গানের কয়েক লাইন গাইতে উসকে দেয়। নোয়া তখন হাসতে হাসতে বলেন, ‘হায় হায়! যদি তোমার বিরুদ্ধে মামলা হয়, সেটা কিন্তু আমার দোষ না।’

আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (এনএফএল) সুপার বোল হাফটাইম শোতে মূল আকর্ষণ হিসেবে গাইবেন ব্যাড বানি। এ নিয়ে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন অঙ্গনের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া ও বিনোদন ইভেন্টের মধ্যে অন্যতম। এমন আয়োজনে তাকে নির্বাচন করা ‘একেবারেই হাস্যকর’ মন্তব্য করে ট্রাম্পের দাবি, ব্যাড বানির নাম তিনি কখনও শোনেনইনি! এছাড়া সুপার বোল হাফটাইম শোতে ব্যাড বানিকে যুক্ত করায় ডানপন্থী রক্ষণশীল গোষ্ঠী সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টি নোয়েমও ব্যাড বানিকে সুপার বোলে নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।অলিভিয়া ডিনঅভিবাসী তরুণীর জয়

সেরা নিউ আর্টিস্ট পুরস্কার পেয়েছেন ব্রিটিশ সোল-পপ গায়িকা অলিভিয়া ডিন। পুরস্কার গ্রহণ করে গ্র্যামি মঞ্চে তিনিও অভিবাসীদের পক্ষে কথা বলেন। তার দাদি কিশোরী বয়সে নতুন জীবনের খোঁজে গায়ানা থেকে ব্রিটেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অলিভিয়া বলেন, ‘সত্যিই কখনও ভাবিনি এখানে দাঁড়াবো। একজন অভিবাসীর নাতনি হিসেবে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি সাহসের ফল, আর আমি মনে করি সেই মানুষগুলো উদযাপনের যোগ্য। আমরা একে অপরকে ছাড়া কিছুই নই।’

গতবার সেরা নিউ আর্টিস্ট পুরস্কার পান চ্যাপেল রোন। তার হাত থেকে প্রথম গ্র্যামি গ্রহণ করে আবেগাপ্লুত অলিভিয়া ডিন। ২০১৯ সালে দুয়া লিপার জয়ের পর প্রথম ব্রিটিশ শিল্পী হিসেবে সেরা নিউ আর্টিস্ট স্বীকৃতি পেলেন ২৬ বছর বয়সী এই তরুণী। তার ‘দ্য আর্ট অব লাভিং’ অ্যালবামটি গত বছর দারুণ শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। এরমধ্যে ‘ম্যান আই নিড’ গানটি তো ভাইরাল!

অভিবাসীদের পক্ষে সরব গ্র্যামিজয়ীরা

টেলিভিশনে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সম্প্রচারিত গ্র্যামির মূল অনুষ্ঠানের বিভিন্ন মুহূর্তে অভিবাসীদের প্রতি সংগীতশিল্পীদের সংহতির প্রতিফলন দেখা গেছে। বেশ কয়েকজন তারকা ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমননীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ব্যাড বানির পাশাপাশি বিলি আইলিশ ‘আইস আউট’ উচ্চারণ করে অভিবাসীদের সমর্থনে কথা বলেন। ‘ওয়াইল্ডফ্লাওয়ার’-এর জন্য সেরা ‘সং অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়ে গ্র্যামি-মঞ্চে ২৪ বছর বয়সী এই গায়িকা বলেন, ‘চুরি করা ভূখণ্ডে কেউই অবৈধ নয়। ধিক্কার আইস।’

বিলি আইলিশ ও কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবারসহ অনেক সংগীতশিল্পী ‘আইস আউট’ লেখা ব্যাজ পরে লালগালিচায় আসেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য–  রক ব্যান্ড ওকে গো’র প্রধান গায়ক ড্যামিয়ান কুলাশ, গীতিকার-সুরকার অ্যামি অ্যালেন।বিলি আইলিশ ও ব্যাড বানিবিলি আইলিশকে অভিনন্দন জানানোর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেফ্রি এপস্টাইনের মধ্যকার সম্পর্কের প্রসঙ্গ তোলেন সঞ্চালক ট্রেভর নোয়া। রসিকতার সুরে তিনি বলেন, ‘এপস্টাইন চলে যাওয়ায় ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা চান, কারণ এখন তার আড্ডা দেওয়ার জন্য নতুন একটা দ্বীপ দরকার।’

এদিকে ট্রাম্প ও সমালোচিত ফেডারেল বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘স্ট্রিটস অব মিনিয়াপোলিস’ শিরোনামের একটি গান প্রকাশ করেছেন ব্রুস স্প্রিংস্টিন। এবারের গ্র্যামিতে সেরা রেকর্ডিং প্যাকেজ বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছে আমেরিকান এই সংগীতশিল্পীর ‘ট্র্যাকস টু: দ্য লস্ট অ্যালবামস’।