মেক্সিকো সিটির আকাশ তখন উৎসবের আলোয় রঙিন। ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। ফুটবল বিশ্বের চোখ তখন মেক্সিকোতে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পর্দা উঠল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। তবে প্রথম বাঁশি বাজার আগের ৯০ মিনিট ফুটবলপ্রেমীরা ডুবে রইলেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক মহোৎসবে, যেখানে ল্যাটিন ঐতিহ্য, আদিবাসী সংস্কৃতি এবং আধুনিক পপ মিউজিকের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেখল বিশ্ব।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম তিনটি ভিন্ন দেশে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হচ্ছে, যার প্রথমটি সম্পন্ন হলো মেক্সিকোতে। আর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেবল একটি কনসার্ট নয়, বরং উত্তর আমেরিকার সংস্কৃতির এক বিশাল প্রদর্শনী হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আদিবাসী ঐতিহ্যের নান্দনিকতা ও ‘পাপেল পিকাডো’র জাদু
সাংস্কৃতিক পরিবেশনার শুরুতেই গ্যালারি ও মাঠজুড়ে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প ‘পাপেল পিকাডো’ (কাগজ কেটে তৈরি বিশেষ নকশা)-এর আদলে তৈরি চোখধাঁধানো ভিজ্যুয়াল ফুটিয়ে তোলা হয়। মেক্সিকোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক শেকড়কে সম্মান জানাতে মঞ্চে হাজির হন দেশটির আদিবাসী পারফর্মাররা। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাদের লোকনৃত্য এবং সমসাময়িক ফোকলোর অ্যাক্টের নান্দনিক কোরিওগ্রাফি পুরো স্টেডিয়ামকে এক মায়াবী আবহে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বর্ণিল পোশাক আর প্রযুক্তিনির্ভর থ্রিডি মঞ্চসজ্জা উদ্বোধনী আয়োজনের নান্দনিকতাকে নিয়ে যায় এক ভিন্ন উচ্চতায়।
মঞ্চ মাতালেন শাকিরা-বার্না বয়: প্রথমবার লাইভে ‘দাই দাই’
বিশ্বকাপের মঞ্চ আর কলম্বিয়ান পপ কুইন শাকিরা—এই দুটি নাম যেন একে অপরের পরিপূরক। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণই ছিল এই পপ তারকার উপস্থিতি। মঞ্চে তার নাম ঘোষণা হতেই গ্যালারিতে রীতিকতো করতালির ঝড় ওঠে। নাইজেরিয়ান সুপারস্টার বার্না বয়ের সাথে মঞ্চে এসে শাকিরা পরিবেশন করেন ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যান্থেম বা থিম সং ‘দাই দাই’ । এই প্রথম গানটি কোনো লাইভ মঞ্চে পরিবেশন করলেন এই দুই গ্লোবাল আইকন। আফ্রোবিট আর ল্যাটিন পপের এই অনবদ্য ফিউশন দর্শকদের নাচতে বাধ্য করে।
ল্যাটিন ও মেক্সিকান তারকাদের মেলা
শুধু শাকিরা বা বার্না বয়-ই নন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে রঙিন করতে মেক্সিকোর ঘরের তারকা এবং বিশ্বখ্যাত ল্যাটিন শিল্পীদের এক বিশাল লাইনআপ জড়ো করেছিল ফিফা। কলম্বিয়ান তারকা জে বালভিন মঞ্চে ঝড় তোলেন তার জনপ্রিয় ট্র্যাকগুলো দিয়ে। বিশেষ করে তরুণদের ক্রেজ রায়ান কাস্ত্রো মঞ্চে এসে জে বালভিনের সাথে এক যুগল পরিবেশনায় মেতে ওঠেন।
মেক্সিকোর নিজস্ব সঙ্গীত ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে মঞ্চে আসেন গ্র্যামি জয়ী কিংবদন্তি পপ-রক ব্যান্ড ‘মানাঁ’। এছাড়া বেলিন্ডা, ড্যানি ওশান, লিলা ডাউনস এবং লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলসের মতো জনপ্রিয় মেক্সিকান ও ল্যাটিন শিল্পীদের একের পর এক পরিবেশনা অনুষ্ঠানটিকে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ দেয়।
আবেগঘন জাতীয় সঙ্গীত ও সালমা হায়েকের উপস্থিতি
সাংস্কৃতিক আয়োজনের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন মেক্সিকোর অন্যতম জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী আলেহান্দ্রো ফার্নান্দেজ স্বদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অন্যদিকে উদ্বোধনী ম্যাচের অপর দল দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে শোনান দক্ষিণ আফ্রিকান তরুণ সেনসেশন টাইলা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের এই বিশাল আয়োজনে বিশেষ অতিথি ও ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মাঠে উপস্থিত ছিলেন মেক্সিকান-আমেরিকান একাডেমি অ্যাওয়ার্ড মনোনীত বিখ্যাত অভিনেত্রী ও পরিচালক সালমা হায়েক পিনল্ট। তিনি স্টেডিয়ামে উপস্থিত বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল ভক্তকে মেক্সিকোর মাটিতে স্বাগত জানান এবং ফুটবলের একতার বার্তা ছড়িয়ে দেন।
বিশ্বরেকর্ড ও তিন দেশের ত্রয়ী আয়োজন
মেক্সিকোর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ইতিহাস গড়ে ফেলল অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) উদ্বোধনী ম্যাচ বা অনুষ্ঠান আয়োজনের অনন্য কীর্তি গড়ল পেলে-ম্যারাডোনার স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক মাঠ।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই আয়োজনকে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শো’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মেক্সিকোর এই বর্ণিল সাংস্কৃতিক যজ্ঞের পর বিশ্বকাপের উদ্বোধনী রেশ ছড়াবে কানাডার টরন্টো এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। যেখানে মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট এবং কেটি পেরির মতো তারকারা নিজ নিজ দেশের সংস্কৃতির ডালি নিয়ে হাজির হবেন। তবে প্রথম রাতটি যে শাকিরা, বার্না বয় এবং মেক্সিকোর চোখধাঁধানো লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় ফুটবল ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে রইল, তা বলাই বাহুল্য।