‘বুদ্ধি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে সৃজন করো’: সংস্কৃতি অঙ্গনে এক ‘শিল্প মহারাজের’ প্রস্থান

আজ সকালে বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও পাপেটম্যান মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে শোক আর স্মৃতিচারণার ঢল। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন আস্ত একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর চিরবিদায়ে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। প্রবীণ সহকর্মী থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-নির্মাতা—সবার লেখায় আজ ফুটে উঠছে এক পরম অভিভাবক ও 'শিল্প সারথি'কে হারানোর তীব্র বেদনা।

আমরা কাকে হারালাম, নিজেরাও জানি না

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রস্থানে বিটিভি আমলের স্মৃতি হাতড়ে প্রবীণ টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও লেখক খ ম হারুণ এক আবেগঘন শোকবার্তায় লিখেছেন,

“বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, টেলিভিশনে আমার পথপ্রদর্শক, বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আজ সকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা কী হারালাম কাকে হারালাম তা আমরা নিজেরাই জানি না।”

শুধু টেলিভিশন মাধ্যমই নয়, শিল্পের প্রতিটি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য। নাট্যকার মাসুম রেজা তাঁকে ‘শিল্পের মহারাজ’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন,

“মুস্তাফা মনোয়ার, শিল্পের বহুধা শাখায় তিনি রাজত্ব করেছেন। শিখিয়েছেন তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীকে, শিখিয়েছেন চিত্রকলা, পাপেট্রি, নাটক নির্মাণ, নাটক রচনা কৌশল। নন্দনতত্ত্বের বিস্তৃত অনুধাবন ও অনুশীলন তাকে করে তুলেছিল শিল্পের মহারাজ। আমাদের প্রজন্মের শিক্ষকদের তিনি ছিলেন শিক্ষক। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর নির্মিত রবিঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ আমার মতে টেলিভিশনের এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ নির্মাণ।”

অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী তাঁর শোকবার্তায় এই গুণী মানুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, “বিদায়, শ্রদ্ধেয় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। অনন্তলোকে চিরশান্তিতে থাকুন।”

নতুন প্রজন্মের স্বপ্নের কারিগর

টেলিভিশনের পর্দায় মুস্তাফা মনোয়ারের উপস্থিতি তরুণদের মনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তা প্রকাশ পেয়েছে হালের জনপ্রিয় সব নির্মাতাদের স্মৃতিচারণে। ‘হাওয়া’ খ্যাত নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন এবং অভিনেতা ও নির্মাতা জিয়াউল হক পলাশ দুজনেরই শৈশবের স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন এই প্রবীণ শিল্পী।

পলাশ লিখেছেন, “ছোটবেলায় আপনাকে দেখে ছবি আঁকতে ইচ্ছে করেছিল। সেই ছবি আঁকাই আমার ফিল্মমেকিংয়ের স্বপ্ন বুনেছিল।” অভিনেত্রী নাজিয়া হক অর্ষাও সুর মিলিয়ে বলেন, “আপনি আমার জীবনে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা। ছোটবেলা ‘মনের কথা’র (মুস্তাফা মনোয়ারের অনুষ্ঠান) জন্য সুন্দর ছিল।”

অন্যদিকে নির্মাতা মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁকে স্মরণ করেছেন “শিশুদেরকে একটি স্বপ্নময় শৈশব উপহার দেওয়ার কারিগর” হিসেবে।

পুতুলে প্রাণের আনাগোনা ও সেই অদ্ভুত শিল্প সংসার

১৯৯৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ারের সেই জাদুকরী পাপেটের দলে কিছুদিন কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল অভিনেত্রী শাহনাজ খুশির। স্যারের চলে যাওয়ার দিনে স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি লিখেছেন,

“চলে গেলেন পরম শ্রদ্ধেয় গুণীজন, মুস্তাফা মনোয়ার স্যার। পুতুলে প্রাণের আনাগোনা! সে সব গল্পের চমৎকার ভুবন! শিল্পের সাথেই বসবাস ছিল, ছিল হাজারো রং, ভাবনা ও সেই শিল্পের বাস্তবায়ন। ১৯৯৪ সালে আমিও কিছুদিন তার সাথে এই অদ্ভুত শিল্প সংসারে কাজ করেছি। কথা বলেছি এই পাপেটের কণ্ঠে। কী দারুণ কৌশল! দেখেছি-শিখেছি অনেক কিছু।”

২০২২ সালে কলকাতার নিউ মার্কেটের রাস্তায় এই মহান শিল্পী ও তাঁর স্ত্রীর সাথে খুশির আকস্মিক শেষ দেখা হওয়ার স্মৃতিটি আজ বারবার তাঁর মনে দোলা দিচ্ছে।

বুকের ভেতরের লাল টুকটুকে স্বপ্ন

তরুণ সংস্কৃতিকর্মী ও সংগীতশিল্পী তুহিন কান্তি দাশের এক সামান্য অথচ অসামান্য স্মৃতিচারণায় উন্মোচিত হয়েছে মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের মূল দর্শন। মাত্র একবার এই গুণী মানুষের সাথে তাঁর দেখার সুযোগ হয়েছিল। তুহিনের মুখ থেকে গান গাওয়া ও লেখার কথা শুনে মুস্তাফা মনোয়ার সেদিন বুদ্ধি নয়, বরং হৃদয় দিয়ে তৈরি করার কথা বলেছিলেন।

উনার স্বল্প সময়ের কথার সারমর্ম ছিল—আসল বিষয় বুকের ভেতরের লাল টুকটুকে স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের বীজ কখনও হয়ে উঠে গান, কখনও কবিতা, আবার কখনও চিত্রশিল্পে রূপ নেয়। আর সেই স্বপ্নকে সমৃদ্ধ করতে হলে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে; কারণ যত জানবে, স্বপ্নের পরিধি ততো বাড়বে।

মুস্তাফা মনোয়ার আজ আর নেই। সময়ের স্রোতে ভেসে যাওয়া এই জীবনে তাঁর সাথে আর কারও দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে সেদিনের সেই ছোট্ট শিল্পালু মনে তিনি যে অবিনশ্বর দাগ কেটে গিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে যে রঙের মেলা বসিয়েছিলেন—তা আজীবন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।