রূপকথার সাত ভাই চম্পার ‘পারুল’ যেভাবে হয়ে উঠল কোটি শিশুর ‘মীনা’

বিনোদন রিপোর্ট
২৯ জুন ২০২৬, ১৩:৪১আপডেট : ২৯ জুন ২০২৬, ১৩:৪৪

আজ সকালে বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে শোক আর স্মৃতিচারণার ঢল। কেউ মনে করেছেন ‘নতুন কুঁড়ি’র নির্মাতাকে, কেউ ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’–কে, কেউবা শিশুদের প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের পেছনের মানুষটিকে।

এত সব পরিচয়ের ভিড়েও মুস্তাফা মনোয়ার নিজেকে দেখতেন অন্যভাবে। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তিনি সারা জীবন শিশুমনের মানুষ হয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। আজ সেই চির তরুণের প্রস্থানে বাংলা সংস্কৃতি হারাল তার এক পরম ‘শিল্প সারথি’কে, যার সৃজনশীল ভাবনায় জন্ম নিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর আইকন।

রূপান্তরের ইতিহাস: পাপেট ‘পারুল’ যেভাবে হলো ‘মীনা’

হুগলি, বাঁকুড়া ও কলকাতায় পাপেট দেখে এই শিল্পের প্রতি প্রথম আগ্রহ জন্মেছিল মুস্তাফা মনোয়ারের। তবে বাংলাদেশে কাহিনী-সংবলিত আধুনিক পাপেট প্রদর্শনীর মূল উদ্যোক্তা তিনিই।

তিনি যখন বাংলাদেশে প্রথম আধুনিক পাপেট থিয়েটার শুরু করেন, তখন এর কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন বাংলার অতি পরিচিত রূপকথা ‘সাত ভাই চম্পা’র একমাত্র বোন ‘পারুল’-কে। রূপকথায় পারুল যেমন তাঁর ঘুমন্ত সাত ভাইকে একাই জাগিয়ে তুলেছিল, মুস্তাফা মনোয়ারও ঠিক তেমনি কুসংস্কারে ঘুমিয়ে থাকা সমাজকে জাগিয়ে তুলতে এই ‘পারুল’ পুতুলটিকে তাঁর মূল হাতিয়ার বানান।

বিটিভিতে পারুলকে নিয়ে করা তাঁর শিক্ষামূলক পাপেট শোগুলো এবং পাপেটভিত্তিক শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান ‘ক’ ও ‘খ’ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জেতার পর তা নজর কাড়ে ইউনিসেফের তৎকালীন কর্মকর্তা র‍্যাচেল কার্নেগির। তিনি যখন মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট ‘পারুল’ চরিত্রটি এবং এর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের ক্ষমতা সরাসরি দেখেন, তখন তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইউনিসেফ যখন দক্ষিণ এশিয়ার কন্যাশিশুদের অধিকার ও শিক্ষার জন্য একটি বড়সড় প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা ভাবছিল, তখন র‍্যাচেল কার্নেগি মুস্তাফা মনোয়ারের সেই ‘পারুল’ চরিত্রের ধারণাকেই সামনে নিয়ে আসেন। এই প্রকল্পের মূল উপদেষ্টা ও চালিকাশক্তি হিসেবে যুক্ত ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। রূপকথার পারুল যেভাবে ভাইকে জাগিয়েছিল, বাস্তব সমাজের কন্যাশিশুদের অধিকার সচেতন করতে ঠিক তেমনই এক শক্তিশালী চরিত্রের খসড়া তৈরি করেন তিনি। তাঁর সেই দর্শন—"একটি মেয়েও সমাজকে বদলে দিতে পারে"—সেটিকে ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ভারতীয় অ্যানিমেটর রাম মোহনের তুলিতে এবং ডেনমার্কের অ্যানিমেশনে চূড়ান্ত রূপ নেয় কোটি শিশুর অতি পরিচিত ও প্রিয় অ্যানিমেশন চরিত্র ‘মীনা’।

বিশ্বমঞ্চে অনন্য স্বীকৃতি ও ‘মিশুক’

মুস্তাফা মনোয়ারের উদ্ভাবিত পাপেট শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মানেও লাভ করেছে অনন্য মর্যাদা। তাঁর অসাধারণ এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক পাপেট সংস্থা ইউএনআইএম একমাত্র বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁকে সম্মানজনক সদস্যপদ প্রদান করে।

১৯৮২ সালে তিনি কলম্বোয় ‘অ্যানিমেশন অ্যান্ড পাপেট ফর টেলিভিশন’ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। ঢাকায় জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সাফ গেমসের জন্য তাঁর উদ্ভাবিত বিশাল আকারের চলমান হরিণ পাপেট ‘মিশুক’ সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রশংসিত হয়েছিল।

‘নতুন কুঁড়ি’র পেছনের কারিগর ও বিটিভির দিনগুলো

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ইতিহাস মুস্তাফা মনোয়ারের নাম ছাড়া চিরকালই অধরা রয়ে যাবে। ১৯৭২ সালে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘নতুন কুঁড়ি’র মূল রূপকার ও কারিগর ছিলেন তিনি। বাংলা সংস্কৃতিকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এক অদম্য তাগিদ থেকেই তিনি চারুকলার শিক্ষকতা ছেড়ে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দিয়েছিলেন।

এরপর বিটিভির উপমহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ কিংবা মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকের মধ্য দিয়ে নিজের সৃজনশীলতার এক অনন্য স্বাক্ষর রেখে যান। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর জাদুকরী নির্দেশনায় বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম’ গণসংগীতটি, যেখানে মাত্র ১০ জন শিল্পীর কণ্ঠকে দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল শত শত মানুষের গর্জন; যার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে।

তাঁর এই ক্ষুরধার শৈল্পিক ও নান্দনিক বোধের কদর ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে পড়ার সময় জলরঙে তাঁর আঁকা ছবি দেখে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় মুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, "মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি খুব অল্প রেখায় অনেক কথা বলতে পারে।" অথচ এত সব কিংবদন্তিতুল্য সাফল্যের ভিড়েও নিজের কাজ নিয়ে তিনি আজীবন বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ ছিলেন।

‘ছোট থাকাই ভালো’—জীবনদর্শন ও প্রস্থান

ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামের মেয়ে মেরীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মুস্তাফা মনোয়ারের রয়েছে দুই সন্তান—সাদাত মনোয়ার (বাংলাদেশ বিমানের পাইলট) ও নন্দিনী মনোয়ার। অস্কারজয়ী প্রথম বাংলাদেশী অ্যানিমেটর নাফিস বিন জাফর তাঁর আপন ভ্রাতুষ্পুত্র।

২০১৯ সালে নিজের জন্মদিনে তিনি বলেছিলেন, "জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।"

পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর শৈল্পিক চেতনা, তরুণদের নিয়ে দেখা তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর পাপেটের সুতো কেটে ডানা মেলা ‘পারুল’ ও ‘মীনা’র মাঝে মুস্তাফা মনোয়ার বেঁচে থাকবেন চিরকাল—একজন খাঁটি ‘শিশুমনের মানুষ’ হয়ে।

/আরএইচ/
সম্পর্কিত
বিনোদন বিভাগের সর্বশেষ
রূপকথার সাত ভাই চম্পার ‘পারুল’ যেভাবে হয়ে উঠল কোটি শিশুর ‘মীনা’
রূপকথার সাত ভাই চম্পার ‘পারুল’ যেভাবে হয়ে উঠল কোটি শিশুর ‘মীনা’
যেভাবে সিসিমপুরকে বাংলাদেশের করে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার
যেভাবে সিসিমপুরকে বাংলাদেশের করে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার
বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ
বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ
দুই দিনেই বক্স অফিসে দাপট ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’, কত হলো আয়?
দুই দিনেই বক্স অফিসে দাপট ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’, কত হলো আয়?
‘ভ্যানিশিং ম্যান’ পলাশের সঙ্গী, কে এই জারবীনি?
‘ভ্যানিশিং ম্যান’ পলাশের সঙ্গী, কে এই জারবীনি?