তখন ঘনঘোর অমাবস্যা। ঋতুপর্ণার ‘স্বামী কেন আসামী’, মুনমুনের ‘টারজান কন্যা’ আর পপির 'কুলি' সুপারহিট হয়ে গেছে। ঢাকার প্রতিষ্ঠিত নায়িকারা চোখে সর্ষে ফুল দেখা শুরু করেছেন।
সালমানের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েছেন শাবনূর। বিয়ের মালা গলায় পড়ে ফেঁসে গেছেন মৌসুমী। শাবনাজ বলতে গেলে দৃশ্যপটেই নেই। দিতি আর চম্পার শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থা। নতুনদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাপড় খুলবেন নাকি শাবানা-ববিতার মতো মাথায় ঘোমটা তুলবেন, এই ভেবে তাদের রাতের ঘুম হারাম। ঠিক তখনই চিত্রাকাশ ভরে যায় পূর্ণিমার আলোয়।
সালমান আচমকা চলে যাওয়ায় একটা বিশাল শূন্যতা তৈরি হয় ঢালিউডে। নির্মাতারা দিকশূন্য হয়ে পড়েন। দর্শকের নাড়ী বুঝতে তারা হিমশিম খেয়ে যান। মুম্বাই-কলকাতা থেকে আমদানি করা হয় নায়িকা। তারা স্বল্প পোশাক পরে দর্শকের বিনোদনতৃষ্ণা মেটাবেন। ভিনদেশি নায়িকারা খ্যামটা নেচে ট্রফি নিয়ে যাবেন আর ঢাকার নায়িকারা কি বসে-বসে কড়িকাঠ গুনবেন? তারাও নেমে যান পোশাক খাটো করার প্রতিযোগিতায়। এই অসুস্থ, দমবন্ধ, শ্বাসরূদ্ধকর সময়ে পূর্ণিমা আসেন দখিন হাওয়া হয়ে...।
১৯৯৮ সালের মাঝামাঝিতে পূর্ণিমার আত্মপ্রকাশ। জাকির হোসেন রাজু তার আবিষ্কারক। রোমান্টিক সিনেমার এই নিপুণ হাত তৈরি করে পূর্ণিমাকে। বোমা-বারুদের বিভীষিকাময় সমস্ত সিনেমার বিপরীতে এক মিষ্টি মুখ। বোম্বে থেকে ধেয়ে আসা ঢলের উল্টোস্রোতে ভেসে আসা এক পদ্ম।
'এ জীবন তোমার আমার' ছবিতে পূর্ণিমার বিপরীতে নেয়া হয় টগবগে তরুণ রিয়াজকে। 'পড়ে না চোখের পলক' গানের সঙ্গে তার নাম ছড়িয়ে গেছে শহর-নগর-বন্দরে। যে জুটি 'স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়'—যেন তেমনই এক জুটি রিয়াজ-পূর্ণিমা। তবু 'এ জীবন তোমার আমার' চলেনি; তার অবশ্য কারণ আছে।
একই দিনে অর্থাৎ ১৯৯৮ সালের ১৫ই মে মুক্তি পায় 'এ জীবন তোমার আমার' এবং 'ভন্ড'। শহীদুল ইসলাম খোকনের এই ছবিটা দুর্ভাগ্যের কারণ হয় পূর্ণিমার। কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। আরেক নবাগতা তামান্না ওই ছবি দিয়ে বক্স অফিসের লক্ষ্মী বনে যান। অথচ এ জীবন তোমার আমার' সুপারহিট হওয়ার যাবতীয় রসদে পূর্ণ।
এটি 'জীবন সংসার' ছবির পর তরুণ পরিচালক জাকির হোসের রাজুর দ্বিতীয় ছবি। 'বেদের মেয়ে জোৎস্না' ছবির প্রডাকশন হাউজ আনন্দমেলা চলচ্চিত্র থেকে নির্মিত। আলাউদ্দিন আলীর অসাধারণ সুরে ভর্তি ১৫টি রিল। আর একদম তাজা, সৌরভে ভরা নতুন জুটি। এই ছবি না চলার কোনো কারণই নেই!
দেখুন, সময়টা নব্বই দশক। তখন একজন শিল্পীর একটা ছবি না চললে নির্মাতারা কখনোই তার হাত ছেড়ে দিতেন না। যদি কারও মধ্যে সামান্য বারুদ থাকত, তার থেকে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ তৈরির নিরন্তর চেষ্টা করে যেতেন নির্মাতারা। যে জাকির হোসেন রাজুর হাতে রক্তাক্ত হয় সদ্য-কৈশোর-ডিঙানো পূর্ণিমার অভিষেক, সেই জাকির হোসেন রাজুর হাত থেকেই নিজের প্রথম সুপারহিট ছবিটি বুঝে পান পূর্ণিমা। ঠিকই পড়ছেন, এই তারকাকে প্রথম সুপারহিটের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ৯ ছবি পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত রাজু, রিয়াজ ও পূর্ণিমা বক্স অফিস জয় করেন 'নি:শ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি'র মধ্য দিয়ে।
আবার যে শহীদুল ইসলাম খোকনের হাতে স্বপ্নভঙ্গ হয় পূর্ণিমার, সেই শহীদুল ইসলাম খোকনেরই হাত ধরে তার ক্যারিয়ারে আসে দ্বিতীয় সুপারহিট ছবি। এই পরিচালকের 'ভন্ড' ছবিতে কাজ করার কথা ছিল পূর্ণিমার। ব্যাটে-বলে মেলেনি বলে ছবিটি করা হয়নি। শেষে কিনা 'ভন্ড' ছবিরই হাতে খুন হয় তার অভিষেক ছবি 'এ জীবন তোমার আমার'! সেই দুঃখ অবশেষে ঘোচে শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত 'যোদ্ধা'র আপাদমস্তক সাফল্যের মধ্য দিয়ে।
'এ জীবন তোমার আমার' থেকে নিঃশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি' পর্যন্ত পূর্ণিমার আসতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। এরমধ্যে তারকা হিসেবে তাকে তৈরি করেছেন জাকির হোসেন রাজু, শহীদুল ইসলাম খোকন, নায়করাজ রাজ্জাকরা। কোনো ছবি সুপারহিট হওয়ার আগেই পূর্ণিমা নায়করাজের দুটি ছবি 'সন্তান যখন শত্রু' এবং 'প্রেমের নাম বেদনা'য় অভিনয় করেন। রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্সের সঙ্গে কাজ করা মানেই তো সুপারস্টার খেতাব পাওয়া। নায়করাজের নির্দেশনায় কাজ একজন তরুণ শিল্পীর কাছে শিক্ষাসফরের চেয়ে কম নয়। পূর্ণিমার অভিনয় শেখার ক্ষেত্রেও এই দুটো ছবি দুটো সেমিস্টারের কাজ করেছে।
বক্স অফিসে ব্যর্থ একটা ছবি থেকে কীভাবে একজন সফল তারকার জন্ম হতে পারে, তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত পূণির্মা। ছাইভস্ম থেকে হীরা খুঁজে এনে দর্শকের দরবারে কীভাবে পেশ করতে হয়, তা জানতেন সেই সময়ের নির্মাতারা। এভাবেই যুগের পর যুগ তারা তারকা তৈরি করেছেন, সুপারস্টার তৈরি করেছেন। এমন জহুরী-নির্মাতার অভাবেই আজকাল সুপারস্টার তৈরি হচ্ছে না। সমস্ত সম্ভাবনা মজুদ থাকার পরও ভ্রুণ অবস্থায় মরে যাচ্ছে, অঙ্কুরে ঝরে যাচ্ছে প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা।
ধরুন, নাজিফা তুষির কথা। সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত অভিনেত্রী। রায়হান রাফীর 'প্রেশার কুকার' আর মেজবাউর রহমান সুমনের 'রইদ' ছবিতে অভিনয় করে তুষি তুষের মতো ধিকি ধিকি নয়, জ্বলছেন ধ্রুবতারার মতো। অথচ একজন সুপারস্টার হিসেবে তিনি জ্বলে উঠতে পারছেন না। ২০১৬ সালে রেদওয়ান রনির আইসক্রিম ছবিতে তার অভিষেকের ১০ বছর পূরণ হচ্ছে চলতি বছর। এক দশকেও একজন সুপারস্টার হয়ে উঠতে পারেননি তুষি। এই ব্যর্থতা আসলে কার?
'আইসক্রিম' ভাল চলেনি, গলে গেছে। কিন্তু তুষি শক্ত অভিনেত্রী। তিনি নিজের ভেতরের আগুনকে পুষে রেখেছেন। একজন অভিনেত্রী হিসেবে তার জয়ধ্বনি এখন কান পাতলেই শোনা যায়। কিন্তু বক্স অফিসে কবে তার নিশান উড়বে? ২০২২ সালে মেজবাউর রহমান সুমনের 'হাওয়া' সুপারহিট হয়েছে। তুষির নামে জয়ঢাক বেজেছে। তারপর চারটা বছর কেটে গেছে। তুষির নাম যখন সবাই ভুলতে বসেছে তখনই তার সদর্পে প্রত্যাবর্তন।
এই যে প্রশংসার তুবড়ি, স্তুতির লহর, বন্দনার বহর—এরমধ্যেই কি সব শেষ? তুষি কি একজন পূর্ণিমা হয়ে উঠতে পারতেন না? কেন আমরা পূর্ণিমার পর আর কোনো সুপারস্টার অভিনেত্রী পেলাম না? কেন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে নায়িকা আমদানি করতে হয়? কেন আমরা আলিয়া ভাট, কিয়ারা আদভানি, রাশমিকা মান্দানার মতো সুপারস্টার তৈরি করতে পারছি না?
আমাদের সিনেমার মান আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। চৌর্যবৃত্তি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। আমাদের স্থানীয় গল্পে হাসছে বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবগুলো। অথচ আমরা সুপারস্টার জন্ম দিতে ভুলে গেছি। বক্স অফিসের সঙ্গে যে শিল্পমানের গতিময় গাঁটবন্ধন হতে পারে, সেই বিদ্যা আমরা ভুলতে বসেছি।
পূর্ণিমা কি চাষী নজরুল ইসলামের 'সুভা', 'শাস্তি', 'মেঘের পরে মেঘ' করেননি? আবার তিনিই 'মনের মাঝে তুমি'র মতো ব্লকবাস্টার ছবির অভিনেত্রী। তার অভিনয়দক্ষতা নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তুষিদের পক্ষেও সম্ভব একই সঙ্গে সিনেপ্লেক্স আর সমালোচকদের তুষ্ট করা।
কিন্তু সেই নির্মাতাদেরই আজ অভাব যারা সুপারস্টার তৈরির নিরলস কাজটি করতে পারেন। সেই প্রযোজনা সংস্থা আর নেই যারা একজন অভিনেত্রীর ওপর বাজি ধরতে পারেন। বর্তমানে সিনেমার সামগ্রিক কাঠামোটাই সুপারস্টার অভিনেত্রী তৈরির প্রতিকূলে।
সিনেমায় এখনও অনেক রাত। পূর্ণিমার প্রয়োজন। অনেক আলো চাই।
সিনেমায় এখনও অনেক রাত। পূর্ণিমার প্রয়োজন। অনেক আলো চাই।