একসময় ব্যাটম্যান মানেই ছিল একটু মজার, একটু হাস্যরসাত্মক এক সুপারহিরো। টাইটসের ওপর আন্ডারওয়্যার, হাতে শার্ক রিপেলেন্ট স্প্রে, আর একেবারেই হালকা-চালের আবহ; এমন চরিত্রের আবহেই চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের জনপ্রিয় টিভি সিরিজে। কিন্তু সেই ব্যাটম্যান একসময় বদলে গেলেন। এখনকার প্রজন্মের কাছে ব্যাটম্যান মানেই গম্ভীর ও মানবিক সুপারহিরো—যার মূল শক্তি কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নয়, বরং বুদ্ধি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও অপরাধের বিরুদ্ধে অদম্য মানসিকতা।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ফ্র্যাঙ্ক মিলারের কমিক ‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’ শুধু ব্যাটম্যানকে নতুন করে হাজির করেনি, বদলে দিয়েছিল পুরো সুপারহিরো কমিকসের ভাষা। সেই পরিবর্তনের প্রভাব চার দশক পরও দেখা যায় হলিউডের ব্যাটম্যান সিনেমায়।
কমিকটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল চার পর্বের মিনি সিরিজ হিসেবে। সেখানে ব্যাটম্যান আর আগের মতো ভদ্র গোয়েন্দা নন। তিনি হয়ে ওঠেন অন্ধকারাচ্ছন্ন, কঠোর এবং ভয়ংকর এক ভিজিল্যান্ট—যিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে অত্যন্ত নির্মম হয়ে উঠতেও দ্বিধা করেন না।
ফ্র্যাঙ্ক মিলারের ভাবনাটা অবশ্য শুধু ব্যাটম্যানকে বদলে দেওয়া ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল সুপারহিরো গল্পের প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করে বড়দের জন্যও অর্থবহ একটি গল্প বলা।
মিলারের ভাষায়, বাস্তব পৃথিবীতে সুপারম্যান নেই, ব্যাটম্যানও নেই। কিন্তু ভালো বা মন্দ কাজে ব্যবহার করা যায়—এমন বিশাল সামরিক শক্তি যেমন আছে, তেমনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই শিশুদের গল্পের পরিচিত প্রতীক ও চরিত্র ব্যবহার করেই তিনি বয়স্ক পাঠকদের জন্য একটি গল্প বলতে চেয়েছিলেন।
অবসর ভেঙে ফিরে এলেন ব্যাটম্যান
‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’-এর গল্প শুরু হয় ভবিষ্যতের কাছাকাছি এক সময়ে। ব্রুস ওয়েন তখন মধ্যবয়সী। প্রায় এক দশক আগে তিনি ব্যাটম্যানের জীবন ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু গথাম সিটির পরিস্থিতি তখন ভয়াবহ। ব্যাটম্যানের অনুপস্থিতিতে শহরটি পরিণত হয়েছে অপরাধ আর সহিংসতায় ভরা এক নরকপুরীতে। চারদিকে খুনে গ্যাং, অপরাধ আর বিশৃঙ্খলা।
এই পরিস্থিতিতেই আবার ফিরে আসেন ব্রুস ওয়েন। আবারও গায়ে চাপান ব্যাটম্যানের পোশাক। মিলার চেয়েছিলেন, ছোটবেলায় দেখা ১৯৫০-এর দশকের ব্যাটম্যানের সেই বিশাল, পিতৃসুলভ ও শক্ত চেহারাটিকে ফিরিয়ে আনতে। তবে এবার তার সঙ্গে যোগ করেন ‘ডার্টি হ্যারি’ ও ‘ডেথ উইশ’-এর মতো চরিত্রের কঠোরতা। ফলে তৈরি হয় সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যাটম্যান।
মিলারের নিজের ভাষায়, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা কোনো চরিত্রকে ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো তাকে একেবারে পুনরুত্থিত করা।
গথাম সিটি তখন অপরাধীদের দখলে
‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’-এর গথাম সিটি অনেকটাই তৈরি হয়েছিল মিলারের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৭০-এর দশকে গ্রামীণ ভারমন্ট থেকে নিউইয়র্কে চলে এসেছিলেন তিনি। শহরটিকে ভালোবাসলেও সে সময় নিউইয়র্ককে দেখেছিলেন গুরুতর অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি শহর হিসেবে।
সেই অভিজ্ঞতার ছাপ পড়ে তার গথামেও। এই গথামের ব্যাটম্যান আগের মতো অপরাধীদের ধরে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না। তিনি অপরাধীদের ভয় দেখান, পিটিয়ে কাবু করেন, প্রয়োজনে হাড়ও ভেঙে দেন। চরিত্রটির এই নির্মমতা এতটাই তীব্র ছিল যে ডিসি কমিকসের সম্পাদকরা আপত্তি করবেন কি না, তা নিয়েও মিলারের মধ্যে আশঙ্কা ছিল।
তার সঙ্গে সম্পাদকদের এ নিয়ে অনেকবার আলোচনা ও মতবিরোধ হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি ছিল সৃজনশীল কাজের স্বাভাবিক অংশ।
বদলে গেল সুপারম্যান ও জোকারও
ব্যাটম্যানের পাশাপাশি ‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’-এ বদলে যায় আরও অনেক পরিচিত চরিত্র। সুপারম্যান এখানে সরকারের অনুগত এক চরিত্র। যে প্রেসিডেন্টের অধীনে তিনি কাজ করছেন, তার মধ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ছায়া দেখা যায়। আর জোকার হয়ে ওঠেন ভয়ংকর এক স্যাডিস্ট।
মিলার অবশ্য তার এই জোকারকে সম্পূর্ণ নতুন সৃষ্টি মনে করেন না। বরং তিনি মনে করেন, পুরোনো জোকারের কাছেই ফিরে গিয়েছিলেন।
১৯৪০ সালে জোকার যখন প্রথম কমিকসে এসেছিলেন, তখন তিনি হাস্যরসের চরিত্র ছিলেন না। ছিলেন একজন নির্মম খুনি। মিলারের বক্তব্য ছিল, তিনি কমিকসকে আবার সেই পুরোনো পাল্প ফিকশনের জগতে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন—‘দ্য শ্যাডো’ এবং সেই সময়ের অন্যান্য পাল্প নায়কদের কাছে।
কমিকের পাতায় ছিল অবিশ্বাস্য ঘনত্ব
‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’ শুধু গল্পের জন্যই আলাদা ছিল না। এর নির্মাণও ছিল ব্যতিক্রমী। ১৯৮৬ সালে একটি সাধারণ সুপারহিরো কমিকে প্রায় ২২ পৃষ্ঠা থাকতো। প্রতিটি পাতায় থাকত ছয়-সাতটি করে ছবি বা প্যানেল। কিন্তু মিলারের প্রতিটি সংখ্যায় ছিল ৪৬ পৃষ্ঠা। অনেক পাতাকে তিনি আবার ভাগ করেছিলেন ১৬টি ছোট ছোট প্যানেলে।
তার লক্ষ্য ছিল পাঠককে এমনভাবে গল্পের মধ্যে আটকে রাখা, যাতে চোখ সরানো কঠিন হয়ে যায়। দ্রুতগতির দৃশ্য আর ছোট ছোট প্যানেল মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন এক ধরনের ছন্দ, যা পাঠককে টেনে নিয়ে যায় পরের দৃশ্যে।
মিলারের আঁকা ছবিতে শেষ ছোঁয়া দিয়েছিলেন ক্লাউস জ্যানসন। আর রঙের কাজ করেছিলেন লিন ভার্লি, যিনি তখন মিলারের সঙ্গীও ছিলেন।
প্রতিটি শব্দ ও ছবি নিয়ে কাজ করায় কমিকের প্রতিটি সংখ্যা শেষ করতেও অনেক সময় লাগত। একেকটি সংখ্যা প্রকাশ পেত কয়েক মাস দেরিতে। কিন্তু সেই দেরি পাঠকদের আগ্রহ কমায়নি। বরং প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে বিক্রি বাড়তে থাকে।
রাতারাতি বদলে গেলো মিলারের জীবন
কমিকটি প্রকাশের পর ফ্র্যাঙ্ক মিলারের জীবনও বদলে যায়। তার ভাষায়, তার জীবন যেন এক রাতের মধ্যেই পাল্টে গিয়েছিল। সময়টা ছিল দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ, আবার আনন্দেরও।
এরপর শুরু হয় নতুন আলোচনা—সুপারহিরো কমিক কি শুধুই শিশুদের জন্য? এই ধরনের গল্পে কি রাজনীতি, সমাজ, সহিংসতা কিংবা মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব তুলে ধরা সম্ভব?
মিলারের কাজের প্রভাব খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। অন্য লেখক ও শিল্পীরাও তার কাজ অনুসরণ করতে শুরু করেন। মিলার অবশ্য এতে ক্ষুব্ধ নন। তার মতে, কোনো কাজ সফল হলে সেটিকে অনুসরণ করার প্রবণতা থাকবেই।
ব্যাটম্যান সিনেমাতেও ছড়িয়ে পড়লো প্রভাব
‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’-এর প্রভাব শুধু কমিকসেই থেমে থাকেনি। হলিউডের ব্যাটম্যান সিনেমাগুলোতেও এর ছাপ স্পষ্ট। ১৯৮৯ সালে টিম বার্টনের ব্যাটম্যান সিনেমা থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় সব আধুনিক ব্যাটম্যান সিনেমাই কোনো না কোনোভাবে মিলারের কাজ থেকে প্রভাব নিয়েছে। তার কমিকের কঠোরতা, অন্ধকার আবহ এবং নোয়ারধর্মী উপস্থাপনা পর্দার ব্যাটম্যানকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান ট্রিলজির দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিনেমার নামও মিলারের কমিকের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর জ্যাক স্নাইডারের ‘ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান: ডন অব জাস্টিস’ সিনেমায় ‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’ থেকে সরাসরি বেশ কিছু দৃশ্য নেওয়া হয়েছিল।
এর চেয়েও বড় পরিবর্তন ছিল ধারণাটিতে—সুপারহিরো গল্প শুধু শিশুদের বিনোদনের বিষয় নয়। বয়স নির্বিশেষে দর্শকদের জন্য বুদ্ধিদীপ্ত, অন্ধকার এবং পরিণত গল্পও এই ঘরানায় বলা সম্ভব।
তবে নিজের প্রভাব নিয়ে অতিরিক্ত কৃতিত্ব নিতে চান না মিলার। তার মতে, ১৯৮০-এর দশকে আরও অনেক লেখক ও শিল্পী সুপারহিরো ঘরানাকে বদলে দেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন।
চার দশক পর তাই ‘দ্য ডার্ক নাইট রিটার্নস’ শুধু একটি ব্যাটম্যান কমিক নয়। এটি এমন এক কাজ, যা ব্যাটম্যানের পুরোনো চেহারা মুছে দিয়ে তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুনভাবে হাজির করেছিল। হাসতে হাসতে শার্ক রিপেলেন্ট স্প্রে হাতে নেওয়া সেই ব্যাটম্যান বদলে গিয়েছিলেন এক কঠোর, অন্ধকার ও ভয়ংকর চরিত্রে। আর আধুনিক ব্যাটম্যানকে আমরা আজ যেভাবে চিনি, তার পেছনে ১৯৮৬ সালের সেই কমিকের ছায়া এখনও স্পষ্ট।
সূত্র: বিবিসি